বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের সংবেদনশীল প্রতিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্টের চরম আশঙ্কা সত্ত্বেও আকরাম পয়েন্টে একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। নতুন এই পরিকল্পনার আওতায় আকরাম পয়েন্টের টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস নেওয়া হবে মোংলায়, যা পরবর্তীতে অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকারখানা এবং নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হবে।
তবে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, বিরল প্রজাতির বন্য ও জলজ প্রাণীর বিচরণক্ষেত্র এবং দেশের বিদ্যমান পরিবেশ সুরক্ষা আইন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে এ ধরনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবিদ ও পরিবেশবিষয়ক গবেষকরা।
পরিবেশবিদরা বলছেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশের ওপর প্রস্তাবিত টার্মিনালের সম্ভাব্য প্রভাব কী হবে, তা নির্ধারণে পরিবেশগত সমীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বুক চিরে যাওয়া এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের ভয়াবহ পরিবেশগত ঝুঁকি তুলে ধরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুণ চৌধুরী বলেন, ‘আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগটি অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক হলেও সুন্দরবনের পরিবেশগত সংবেদনশীলতার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি সুন্দরবনের প্রতিবেশ, বন্য ও জলজ প্রাণীর বাস্তুসংস্থানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে।’
উপকূলীয় বিষয়ের গবেষক ও সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক তারিক লিটু বিষদ ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, ‘সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের কাছে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এলএনজি মূলত মিথেন গ্যাস, যা অত্যন্ত দাহ্য। আকস্মিক কারিগরি ত্রুটি, পাইপলাইনে গ্যাসের লিকেজ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে সুন্দরবনের বন্য প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক প্রতিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। চলতি বছর মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।’
অতীতের নানা নৌ-দুর্ঘটনার শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারিক লিটু আরও যোগ করেন, ‘২০১৪ সালে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ডুবে যাওয়ার ঘটনায় নদীর পানি ও আশপাশের পরিবেশ দূষিত হয়েছিল। ওই ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে, সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল প্রতিবেশে যেকোনো দুর্ঘটনার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তাই সুন্দরবনের আশপাশে যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণের আগে বনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশগত ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যথাযথ পরিবেশগত সমীক্ষা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়া এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য একবার নষ্ট হলে তার ক্ষতিকর প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হবে প্রকৃতি ও উপকূলের মানুষকে।’
প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনালের ক্ষতিকর প্রভাব ও সম্ভাব্য বিপর্যয় সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। আমাদের কাছে মতামত জানতে চাওয়া হলে অবশ্যই আমরা সুন্দরবন নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিই জানাব।’
প্রকৌশলগত ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রকল্পটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৯৯ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়েছিল, যেখানে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এছাড়া ২০২৩ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় গ্যাস টার্মিনাল এবং ২৫ কিলোমিটারের চেয়ে দীর্ঘ গ্যাস বিতরণ পাইপলাইনকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অর্থাৎ ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে আকরাম পয়েন্ট পশুর ও শিবসা নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনার অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি স্থান। আকরাম পয়েন্টের দুই পাশেই রয়েছে সুন্দরবনের দুটি নিবন্ধিত বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এবং উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে শিবসা ডলফিন অভয়ারণ্য, যা গাঙ্গেয় ও বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতী ডলফিনের প্রধান বিচরণক্ষেত্র।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক মন্ত্রী ইতিমধ্যেই আকরাম পয়েন্ট পরিদর্শন করেছেন। সম্প্রতি এক সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, খুলনার কাছে ২০ মিটার পানির গভীরতাবিশিষ্ট একটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও এলএনজি খালাসের সুবিধাসহ আধুনিক ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও জানান, মোংলা বন্দরের অদূরে আকরাম পয়েন্টে এলএনজি স্টেশন স্থাপন করা হবে। সেখান থেকে পাইপলাইনে গ্যাস মোংলায় নেওয়া হবে। পরে সেই গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।