সড়কে দায়িত্বহীনতা, বিপন্ন মানুষের জীবন

সড়কে প্রতিদিন প্রাণ ঝড়ছে। একটু অসতর্কতা, বেপরোয়া গতি কিংবা দায়িত্বহীন আচরণ কেড়ে নিচ্ছে মানুষের জীবন। অথচ প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। মানুষের জীবন রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সড়কে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

মানুষের প্রাণরক্ষা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলোর একটি। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একজনকে বাঁচালো, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই বাঁচালো।’ (সুরা মায়েদা ৩২)

মানবজীবনের মূল্য কত উচ্চ, তা এ আয়াত প্রকাশ করে। ইসলাম শুধু হত্যা নিষিদ্ধ করেনি, বরং এমন সব কাজ থেকেও দূরে থাকতে বলেছে, যা কারও প্রাণহানির কারণ হতে পারে বা মানুষকে কষ্ট দেয়।

ইসলাম এমন এক সমাজ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে মানুষের চলাচলে সামান্যতম বিঘœও থাকবে না। মানুষের নিরাপত্তা ও স্বস্তি ইসলামি সমাজব্যবস্থার মৌলিক নীতি। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এর পেছনে প্রধানতম দায়ী।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিগত একযুগে বাংলাদেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত এবং ১ লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন আহত হয়েছেন। শুধুমাত্র গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য পেলেও দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র বলছে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি।

ইসলাম যেখানে রাস্তায় পড়ে থাকা কাঁটা বা পাথর সরিয়ে দেওয়াকেও ইমানের অংশ বলে ঘোষণা করেছে, সেখানে সড়কে এমন বিশৃঙ্খলা ও প্রাণহানি আমাদের ধর্মীয় চেতনার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। সড়কে প্রতিদিন যে মানুষগুলো প্রাণ হারাচ্ছে, তারা শুধু দুর্ঘটনার শিকার নয়, তারা আমাদের সামাজিক অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও ইমানি শৈথিল্যেরও শিকার।

ভাবতে অবাক লাগে, প্রতি বছর সড়কে যেভাবে তাজা প্রাণ ঝরে পড়ছে। এরপরও দেশের শাসকবর্গ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষসহ কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। প্রতিদিন সড়কে এত মৃত্যু আমাদের নাড়া দেয় কি? নাড়া দেয়, যখন আমাদের প্রিয়জন বা নিকটস্থ কেউ দুর্ঘটনায় মারা যান বা পঙ্গুত্ববরণ করেন। সবচেয়ে গভীরভাবে নাড়া দেবে, যখন আমরা নিজেরাই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাব বা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করব। তখন সেই গভীর নাড়া আমাদের কি আর ফেরাতে পারবে?

লেখক : ইসলামি গবেষক