নামাজ মানুষের সংকল্প ও শক্তি বাড়ায়

নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। মুমিনের আমলের মানদণ্ড। নামাজ সঠিক হলে অন্যান্য আমলও সঠিক হওয়ার আশা করা যায়। নামাজ নষ্ট হলে অন্য আমলগুলোও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমিরুল মুমিনিন হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কাজগুলোর মধ্যে নামাজই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি নামাজ সংরক্ষণ করে এবং এর প্রতি যতœবান থাকে, সে তার দ্বীনকে সংরক্ষণ করে। আর যে নামাজ নষ্ট করে, সে অন্য বিষয়গুলো আরও বেশি নষ্ট করার আশঙ্কায় রয়েছে।’

নামাজ স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্কের বন্ধন। নামাজ মানুষকে দুনিয়ার মোহ, আকর্ষণ ও ভোগবিলাস থেকে দূরে রেখে মহান আল্লাহর সেই সম্মানিত আবাসের দিকে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি মুত্তাকি বান্দাদের জন্য এমন নেয়ামত প্রস্তুত রেখেছেন, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে কল্পনাও জাগেনি।

নামাজের জন্য সতর আবৃত করা আবশ্যক। যেখানেই থাকুক, কেবলামুখী হতে হবে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নামাজ শুরু করার সময় নিয়তকে একনিষ্ঠ রাখতে হবে। কোরআন তেলাওয়াত, রুকু, সেজদা, বসা, রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো এবং স্থিরতা বজায় রাখাসহ নামাজের সব রুকন যথাযথভাবে আদায় করতে হবে। কাকের ঠোকরের মতো দ্রুত নামাজ আদায় করা যাবে না। নামাজের সুন্নত ও আদবগুলোও পরিত্যাগ করা যাবে না। কারণ, নামাজ হলো রবের সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের বন্ধন। কেয়ামতের দিন বান্দার আমলগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।

হে আল্লাহর বান্দারা! পবিত্র কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তা, ইমানের মাধুর্য অনুভব, দুনিয়ার জীবন ও পরিণতি উপলব্ধি এবং পরকাল স্মরণ করে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য অন্তরের দরজা খুলে দেয় নামাজ। বুদ্ধিমান ব্যক্তি এর মাধ্যমে এমন আমলের প্রস্তুতি নেয়, যা তাকে মুক্তি ও সফলতা এনে দেয়।

বিপদাপদ, কঠিন পরিস্থিতি, সংকটময় মুহূর্ত এবং ক্লান্তিকর কাজের সময় নামাজ মুসলমানকে শক্তি জোগায়। এটি ধৈর্য ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়, মনোবল দৃঢ় করে এবং অন্তরকে স্থির রাখে।

নামাজ তৃষ্ণার্তের জন্য নির্মল পানির মতো, ক্ষুধার্তের জন্য খাদ্যের মতো এবং দুর্বলতার সময়ে শক্তির মতো। যখন বিপদ বেড়ে যায় এবং মানুষের সাধ্য ও সামর্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন মুসলমানের উচিত মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া এবং নামাজের মাধ্যমে তার নৈকট্য অর্জন করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখন দ্রুত নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। নামাজ মানুষের শক্তি ও সংকল্প বাড়ায়। এতে মহান আল্লাহর সঙ্গে বান্দার একান্ত কথোপকথন হয় এবং আত্মা ও অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।

নামাজ মানুষের বন্ধ অন্তরের দুয়ার খুলে দেয় এবং উদাসীন অন্তরকে জাগিয়ে তোলে, যাতে মানুষ পরিণতি নিয়ে চিন্তা করতে পারে এবং কাজের ফলাফল উপলব্ধি করতে পারে। নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনার প্রতি যে কিতাব ওহি করা হয়েছে, তা তেলাওয়াত করুন এবং নামাজ কায়েম করুন। নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত ৪৫)

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, নামাজের মধ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত রাখার প্রবল শক্তি ও বাধার প্রাচীর রয়েছে।

মানুষকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে সেই নামাজ, যা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আদায় করা হয়। এতে লোক দেখানোর প্রবণতা থাকে না এবং নিজের ইবাদত নিয়ে আত্মতুষ্টিও থাকে না। নামাজের সময় অন্তর উপস্থিত থাকে এবং যা বলে, তা উপলব্ধি করে।

এভাবে নামাজ আদায়কারী আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। যে আল্লাহর নিকটবর্তী হয়, আল্লাহ তাকে পবিত্র করেন এবং তার অন্তর থেকে অজ্ঞতা ও অন্ধকারের আবরণ দূর করে দেন। আল্লাহর বিশেষ যতœ ও অনুগ্রহ তাকে আচ্ছাদিত করে। ফলে তিনি তাকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করেন।

নামাজের জন্য নির্ধারিত সময় রয়েছে। সেই সময়ের মধ্যেই নামাজ আদায় করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ।’ (সুরা নিসা ১০৩)

সুতরাং মুসল্লির অবস্থা ও সামর্থ্য অনুযায়ী মসজিদে জামাতের সঙ্গে যথাসময়ে নামাজ আদায় করতে হবে। এমনকি যুদ্ধের ময়দানে, যখন দুই বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান করে এবং গোলাগুলি চলতে থাকে, তখনো নামাজের সময় পার করে দেওয়া বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকবেন। অতঃপর তাদের জন্য নামাজ কায়েম করবেন, তখন যেন তাদের মধ্য থেকে একদল আপনার সঙ্গে দাঁড়ায় এবং তারা তাদের অস্ত্র ধারণ করে। এরপর যখন সেজদা করে ফেলবে, তখন তারা যেন আপনাদের পেছনে অবস্থান নেয়। আর অপর একটি দল যারা নামাজ আদায় করেনি তারা যেন আপনার সঙ্গে এসে নামাজ আদায় করে এবং তারা যেন তাদের সতর্কতা অবলম্বন ও অস্ত্র ধারণ করে। কাফেররা কামনা করে, যদি আপনারা অস্ত্রশস্ত্র ও আসবাবপত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হন তাহলে তারা আপনাদের ওপর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বে।’ (সুরা নিসা ১০২)

অসুস্থতার সময়ও রোগী যতক্ষণ বুঝতে পারে তাকে কী বলা হচ্ছে এবং সে নিজে কী বলছে, ততক্ষণ তাকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নামাজ আদায় করতে হবে। নামাজের শর্ত ও কাজগুলোর মধ্যে যা সে করতে সক্ষম, তা পালন করবে। যা করতে অক্ষম, তা তার জন্য মাফ। মহান আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।

কেউ ঘুমের কারণে নামাজ পড়তে না পারলে কিংবা ভুলে গেলে, যখনই তার মনে পড়বে, তখনই নামাজ আদায় করবে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ নামাজের সময় ঘুমিয়ে থাকলে অথবা নামাজের কথা ভুলে গেলে যখনই তার মনে পড়বে, তখনই সে নামাজ আদায় করবে। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমাকে স্মরণ করার জন্য নামাজ কায়েম করুন।’ (সুরা তাহা ১৪)

ব্যবসা-বাণিজ্য, পেশাগত কাজ, খেলাধুলা, সভা-সমাবেশ কিংবা আনন্দ-উৎসব কোনোটিই নামাজের সময় শেষ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত নামাজ বিলম্বিত করার বৈধ কারণ হতে পারে না। দুনিয়াবি কোনো কাজের অজুহাতে নামাজ দেরি করার ক্ষেত্রে কোনো মুসলমানের জন্য ছাড় নেই। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের নামাজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। প্রতিটি অনুষ্ঠান ও সভার আয়োজকও দায়িত্বশীল। তিনি যদি নামাজের জন্য সুযোগ করে দেন এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের সতর্ক করেন, তাহলে মহান আল্লাহর কাছে তার দায়মুক্তি ঘটবে।

আল্লাহ আপনাদের প্রতি রহম করুন। আপনারা যথাযথভাবে নামাজ আদায় করুন। আল্লাহ আপনাদের অবস্থা সুন্দর করে দেবেন। রুকু ও সেজদায় স্থিরতা বজায় রাখুস। রুকু থেকে ওঠার পর এবং দুই সেজদার মাঝখানে বসার সময়ও স্থির থাকুন। নিশ্চয়ই স্থিরতা ও একাগ্রতার ঘাটতি নামাজকে বাতিল করে দেয়। কারণ স্থিরতা ও একাগ্রতা নামাজের প্রাণ।

হে মুসলমানরা! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং নামাজের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। আপনাদের সন্তানদের নামাজের নির্দেশ দিন এবং আপনাদের নারীদেরও নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হতে বলুন। আল্লাহর নির্দেশ পালন করুন এবং তার নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকুন। পুনরুত্থান ও হিসাবের দিনের জন্য পর্যাপ্ত পাথেয় প্রস্তুত করুন। পার্থিব জীবন যেন আপানাদের প্রতারিত না করে এবং মহাপ্রতারক শয়তান যেন মহান আল্লাহ সম্পর্কে আপনাদের ধোঁকায় না ফেলে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের নামাজের প্রতি যত্নবান থাকে, তারাই হবে উত্তরাধিকারী। তারা উত্তরাধিকারী হবে ফেরদাউসের, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’ (সুরা মুমিনুন ৯-১১)

১৬ অক্টোবর শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। ভাষান্তর করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান