কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি খাতের কাজের গতি বাড়ালেও কর্মীদের কাজের চাপ কমানো যাচ্ছে না। বরং প্রতি ১০ জনে প্রায় ছয় কর্মী মনে করেন এআই ব্যবহারের পর তাদের কাজের চাপ বেড়েছে। একইসঙ্গে প্রযুক্তি খাতে চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
একদিকে এআইয়ের কারণে উৎপাদনশীলতা বাড়ার প্রত্যাশা, অন্যদিকে এন্ট্রি-লেভেল বা প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিল্প খাতের কর্মীদের ওপর পরিচালিত ওয়েব সামিটের প্রথম ফ্ল্যাগশিপ শিল্প জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
‘স্টেট অব দ্য ইন্ডাস্ট্রি ২০২৬ : এআই সংস্করণ’ শীর্ষক এ জরিপে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ১ হাজার ৪৫৫ জন অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, প্রকৌশলী, পণ্য উন্নয়নকারী এবং সৃজনশীল পেশাজীবীরা। ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্টে পরিচালিত জরিপে কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার, কাজের চাপ, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, চাকরির নিরাপত্তা, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যতের কর্মী কাঠামো সম্পর্কে তাদের মতামত নেওয়া হয়। এরপর গতকাল বৃহস্পতিবার জরিপের তথ্য প্রকাশ করা হয়।
জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এআই তাদের সমালোচনামূলক চিন্তা-ভাবনার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বিপরীতে, প্রকৌশলীদের ৩৭ শতাংশ জানিয়েছেন এআই তাদের সমালোচনামূলক চিন্তা-ভাবনার সক্ষমতা দুর্বল করছে। উত্তরদাতাদের ৪২ শতাংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে ছোট কর্মীদল আরও বেশি কাজ করবে। আর ৩৯ শতাংশ মনে করেন, আগামী ২ বছরে তাদের কর্মক্ষেত্রে কর্মীর সংখ্যা বাড়বে। আর ৩৩ শতাংশ মনে করেন, কর্মীর সংখ্যা কমবে।
ওয়েব সামিটের প্রযুক্তি অপারেশনস বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট নিধি নাইথানি বলেন, এআই উদ্যোক্তাদের কম মানবসম্পদ ও মূলধন ব্যবহার করে আয় করতে সক্ষম কোম্পানি গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওয়েব সামিটে অংশ নেওয়া স্টার্টআপ দলগুলোর আকার ছোট হচ্ছে এবং কয়েক বছর আগে যে পরিমাণ তহবিল প্রয়োজন হতো, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের ততটা অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে না।
কাজের গতি বাড়লেও কমছে না চাপ : এআইয়ের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল, মানুষের কাজ সহজ করা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। কিন্তু জরিপের ফলাফল বলছে, কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার সক্ষমতা বাড়লেও কর্মীদের ওপর চাপ কমার নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, এআই ব্যবহারের ফলে তাদের কাজের চাপ বেড়েছে। ২০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের কাজের চাপ কমেছে। আর ২০ শতাংশ মনে করেন, এআই ব্যবহারে তাদের কাজের চাপে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
এ ছাড়া ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন এআই ও মেশিন লার্নিং অবকাঠামো খাতে কাজের চাপ বেড়েছে। সফটওয়্যার-অ্যাজ-আ-সার্ভিস (সাস) খাতে এ হার ৬৮ শতাংশ এবং হার্ডওয়্যার ও ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) খাতে ৬৭ শতাংশ। পুরুষদের ৬১ শতাংশ কাজের চাপ বৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন। নারীদের ক্ষেত্রে এ হার ৫৬ শতাংশ।
জরিপে উঠে এসেছে, এআই কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারায় কর্মীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত কাজের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে এআই দিয়ে তৈরি করা কাজ যাচাই, সংশোধন এবং মান নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ, এআই যে সময় সাশ্রয় করছে, সেই সময়ের একটি অংশ নতুন কাজের জন্য ব্যয় হচ্ছে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কর্মীদের কাজের চাপ কমছে না।
এন্ট্রি-লেভেল চাকরি নিয়ে উদ্বেগ : প্রযুক্তি খাতে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো ভবিষ্যতে নতুন কর্মীদের জন্য চাকরির সুযোগ কতটা থাকবে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৯ শতাংশ জানিয়েছেন, আগামী ২ বছরে তাদের কর্মক্ষেত্রে কর্মীর সংখ্যা বাড়বে। আর ৩৩ শতাংশ মনে করেন, কর্মী সংখ্যা কমবে। অন্যদিকে ২৮ শতাংশের ধারণা, উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হবে না।
তবে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি নিয়ে উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়েছে জরিপের ফলাফলে। ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি-লেভেল পদের সংখ্যা কমবে। কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী পর্যায়ের উত্তরদাতাদের মধ্যে এ আশঙ্কা আরও বেশি। তাদের ৫০ শতাংশ মনে করেন প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরির সুযোগ কমে যাবে।
এ ছাড়া ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ৪৫ শতাংশ এআইয়ের কারণে নিজেদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এ হার ৩২ শতাংশ। প্রকৌশলীদের মধ্যেও চাকরি হারানোর আশঙ্কা উল্লেখযোগ্য। এআই প্রযুক্তি তৈরি ও ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই পেশাজীবীদের ৪৩ শতাংশ নিজেদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ বিষয়ে আশাবাদী মনোভাবও দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের ৫৫ শতাংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে এন্ট্রি-লেভেল চাকরির সংখ্যা বাড়বে।
ছোট দলে বেশি কাজের প্রত্যাশা : এআইয়ের প্রভাবে শুধু কাজের ধরন নয়, প্রতিষ্ঠানের কর্মী কাঠামোও বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবীরা। এআইয়ের সাহায্যে কোড লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণা, বিপণন, গ্রাহকসেবা এবং প্রশাসনিক কাজের কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় কম কর্মী নিয়েও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পণ্য তৈরি ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবে বলে জরিপে উঠে এসেছে।
এআই বিনিয়োগ নিয়ে সংশয় : এআই প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগের বিষয়টিও জরিপে ওঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ১০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন এআইয়ে বিনিয়োগ বর্তমান গতিতেই অব্যাহত থাকবে। ৩২ শতাংশ মনে করেন বিনিয়োগ ধীরে ধীরে মন্থর হবে। আর ৩৫ শতাংশ মনে করেন এআইয়ে বিনিয়োগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে। তবে অঞ্চলভেদে এ বিষয়ে পার্থক্য দেখা গেছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার প্রায় ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা এআইয়ে অতিরিক্ত বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় এ হার ৩১ শতাংশ, এশিয়ায় ২৯ শতাংশ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় ১৬ শতাংশ।
সুযোগের পাশাপাশি বাড়ছে ঝুঁকি : জরিপে উত্তরদাতারা জানান, এআই ভাষাগত বাধা কমিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে সংযুক্ত করতে পারে। গবেষণার মতো সময়সাপেক্ষ কাজ কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করা, ছোট দল দিয়ে জটিল পণ্য তৈরি এবং নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ স্বয়ংক্রিয় করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। এর ফলে কর্মীরা সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মতো কাজে বেশি সময় দিতে পারবেন।
অন্যদিকে, এআইয়ের ভুলের দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত মানসিক নির্ভরতা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও ধারাবাহিক শেখার আগ্রহ কমে যাওয়া এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমের মতো তথ্যনির্ভর শিল্প এআইয়ের কারণে বড় পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। তথ্য তৈরি, সম্পাদনা, বিতরণ এবং পাঠকের কাছে পৌঁছানোর পদ্ধতি বদলে গেলে সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায়িক কাঠামো ও কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়তে পারে।
একাধিক এআই মডেল ব্যবহার : জরিপের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠানের এআই টুল ব্যবহার করেন। ৪৩ শতাংশ ব্যবহার করেন তিনটি বা তার বেশি টুল।
এআই সমালোচনামূলক চিন্তা বাড়াচ্ছে, নাকি কমাচ্ছে : জরিপে ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন এআই তাদের সমালোচনামূলক
চিন্তাভাবনাকে শক্তিশালী করে। আর ১৯ শতাংশ মনে করেন, এআই ব্যবহারে এ ক্ষেত্রে খুব একটা পার্থক্য হয় না। বয়সভেদেও এ বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৭১ শতাংশ জানিয়েছেন, এআই তাদের চিন্তাভাবনার সক্ষমতা বাড়ায়। আর ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার ৪৮ শতাংশ। অঞ্চলভেদেও পার্থক্য দেখা গেছে।
২০০৯ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে প্যাডি কসগ্রেভের উদ্যোগে ১৫০ জনের একটি প্রযুক্তিবিষয়ক আয়োজন হিসেবে ওয়েব সামিটের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এটি বিশ্বের বড় প্রযুক্তি আয়োজনগুলোর একটি।