চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার এলাকার ব্যবসায়ী মহিন উদ্দিন। গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপ হলেও পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন চকবাজার এলাকায়। গত ২৭ আগস্ট তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুর আগে অন্তত চার মাসের মধ্যে সন্দ্বীপ না গেলেও সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে তার মৃত্যুর এলাকা দেখানো হয়েছে সন্দ্বীপ। এমনটি শুধু মহিন উদ্দিনের বেলাতেই নয়, নগরে বসবাসকারী কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে সিভিল সার্জন তার নাম নিবন্ধন করছেন স্থায়ী ঠিকানা অনুযায়ী। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে মারা গেছেন ৩১ জন। তাদের মধ্যে ১২ জন চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার এবং ১৩ জন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। এ ছাড়া সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্যে ছয়জনকে অন্য জেলার বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের এই দপ্তরের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে উপজেলার চারজন ও ভিন্ন জেলার একজনসহ মৃত অন্তত পাঁচ রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুজন নগরীতেই বসবাস করতেন এবং সেখানেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তাদের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সব রোগীর তথ্য না থাকায় বাকিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া সম্ভব হয়নি। রোগী মারা যাচ্ছেন শহরে কিন্তু গ্রামের ঠিকানায় কেন তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে মারা যাচ্ছেন এবং হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে যে ঠিকানা দেওয়া হয়, আমরা সেটাই গ্রহণ করছি। রিপোর্টে ডেঙ্গু আক্রান্তের স্থান বিবেচনায় আনছেন না কেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাসপাতালের ডেথ সার্টিফিকেটে স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ থাকে। তাই আমরাও সেটা গ্রহণ করি।
কিন্তু এতে তো ডেঙ্গুর উৎপত্তিস্থল আড়ালে থেকে যাচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে সিভিল সার্জন বলেন, নগরীতে এডিশ মশার হটস্পট চিহ্নিত করে কর্ম পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের কার্যক্রম থেমে নেই।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর আবাসস্থল বিবেচনায় না এনে স্থায়ী ঠিকানাকে বিবেচনায় নেওয়া প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, এরকম তো হওয়ার কথা নয়। যে এলাকায় আক্রান্ত হয়ে রোগী মারা যান, সাধারণত ওই এলাকাকেই আমলে নিতে হয়।
এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ওষুধের চেয়ে সচেতনতা ও নিয়মমাফিক জীবনধারণই বড় ভূমিকা রাখে। তাই রোগী যেখানে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন, সে এলাকাকেই মৃত্যুর স্থান দেখানো উচিত। এতে করে ওই এলাকায় বসবাসকারীরা সচেতন হতে পারবেন। তারা বলেন, রোগীর আক্রান্ত এলাকা বাদ দিয়ে যদি স্থায়ী ঠিকানা লিপিবদ্ধ হয় তাহলে ভুল তথ্য ছড়াবে। এতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণও কঠিন হবে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, একজন রোগী যেখানে অবস্থান করার সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, সেটিকেই আক্রান্তের স্থান হিসেবে প্রকাশ করা উচিত। কারণ রোগী তো স্থায়ী ঠিকানায় আক্রান্ত হননি। এতে করে ওই সব এলাকায় মশক নিধনে যেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তেমনি এলাকাবাসীও সচেতন হতে পারবেন।
জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্থায়ী ঠিকানার ওপর নির্ভর করে রোগীর এলাকা নির্ধারণ করা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে রোগী আক্রান্ত হওয়ার আগে কোথায় কোথায় গিয়েছেন, তা জানা জরুরি। আক্রান্ত হওয়ার স্থান নির্ধারণ করা গেলে ওই এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
এদিকে শুধু মৃতদের ক্ষেত্রেই নয়, আক্রান্তদের ক্ষেত্রেও স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন রোগী। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু আক্রান্ত মো. রুবেল বলেন, আমি ইপিজেড এলাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করি। ইপিজেড এলাকাতেই থাকি। কিন্তু আমার গ্রামের বাড়ি কর্ণফুলীর ঠিকানায় আমাকে যুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমাম হোসেন রানা বলেন, বিষয়টি মেয়র মহোদয়ও সিভিল সার্জন অফিসকে জানিয়েছেন। রোগী যে এলাকায় মারা যান, সে এলাকা যদি দেখানো হয়, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর চিত্র : চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনো বেশ উদ্বেগজনক। সরকারি তথ্যমতে, চলতি বছর গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩৪১ জনে, যাদের মধ্যে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসেই সংক্রমণ ও প্রাণহানি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪৩০ জন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন। আর চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ২২ দিনে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯২৫ জন এবং মারা গেছেন ১০ জন।
চট্টগ্রাম মহানগরীতেই আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৩ হাজার ২৬ জন। এ ছাড়া উপজেলায় ২ হাজার ৬৩৬ জন এবং অন্যান্য জেলার ৬৭৯ জন। তবে উপজেলাগুলোর মধ্যে ৭৯৮ জন রোগী নিয়ে শীর্ষে রয়েছে সীতাকুন্ড।
অন্যান্য জেলার সিভিল সার্জনদের বক্তব্য : ডেঙ্গুতে মৃত রোগীর ঠিকানা কোন এলাকাকে ধরা হয় এ বিষয়ে জানতে কয়েকজন সিভিল সার্জনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. সাইয়েদুর রহমান জানান, রোগী যে এলাকায় বসবাস করেন, সে এলাকাকেই রোগীর ঠিকানা হিসেবে ধরা হয়। রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম বলেন, রাজশাহীতে নগরে রোগী মারা গেলে সেটাকে নগরের রোগী হিসেবেই দেখানো হয়। তবে জেলার কোনো উপজেলাতেই আক্রান্ত কোনো রোগীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি বলেও তিনি জানান। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসারে রোগীর ঠিকানা লেখা হয় বলে জানিয়েছেন, খুলনা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মনিরুজ্জামান।
ডেঙ্গুতে মৃতদের তথ্য দিতে অনীহা : এদিকে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। এক মাস আগেও সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে কোভিড-১৯, ডেঙ্গু এবং হামে মারা যাওয়া রোগীর নাম-ঠিকানা ও বয়সসহ যাবতীয় তথ্য মিডিয়া গ্রুপে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু গত এক মাস ধরে এই তথ্য আর প্রকাশ করা হচ্ছে না। এমনকি এ বিষয়ে কোনো তথ্য চাইলে ‘নিষেধ আছে’ বলে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলাকাভিত্তিক আক্রান্ত এবং মৃত ব্যক্তির বয়স, মৃত্যুর কারণ ও আক্রান্ত হওয়ার স্থানসহ আনুষঙ্গিক তথ্য দেওয়া হলে সাধারণে সতর্ক এবং সচেতন হতে পারবেন। এডিস মশা বা ডেঙ্গুর হটস্পট নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এটি বড় ভূমিকা রাখবে।