সাজেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলি

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে দুটি সংগঠনের সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সাজেকের উজোবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে চলা গোলাগুলির পর দুপুরের দিকে পরিস্থিতি শান্ত হতে শুরু করে। এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সাজেকে আটকে পড়া প্রায় ৩ হাজার পর্যটককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।

পুলিশ বলেছে, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যরা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা করে। রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব জানান, সংঘর্ষে সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন এবং পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়েছেন। তবে ইউপিডিএফ গোলাগুলির অভিযোগ অস্বীকার করেছে ।

এ ঘটনায় শনিবার রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলে, সাজেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে ডাকা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদ এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি যৌথভাবে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। সাজেকের বিভিন্ন এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে তারা আন্দোলন করছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের কারণে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই উজোবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা চলছিল। সকালে সাজেক থেকে পর্যটকবাহী গাড়িবহর খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা হলে উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহনের গতিরোধ করেন। বাঘাইহাটের শুকনাছড়াসহ সড়কের কয়েকটি স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভও করা হয়। আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু পরিস্থিতির সমাধান না হওয়ায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এ সময় অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। এতে সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন এবং পুলিশের দুই সদস্য আহত হন। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হলে তারাও পাল্টা গুলি চালান। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থেমে থেমে গোলাগুলি চলে। দুপুরের পর সড়কে যান চলাচল আবার সচল হতে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উজোবাজার ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফ নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। পরে সেনাবাহিনী পাল্টা গুলিবর্ষণ করে।

ঘটনার বিস্তারিত জানাতে দুপুর ২টায় প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুল রকিব। তিনি জানান, সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে উজোবাজারে অবরোধকারীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় অবরোধকারীরা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন এবং পুলিশের দুই সদস্য আহত হন।

তিনি আরো বলেন, পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হলে বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থেমে থেমে প্রায় দুই ঘণ্টা গুলিবিনিময় হয়।

পুলিশ সুপার জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং উজোবাজারের নিয়ন্ত্রণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রয়েছে। এ ছাড়া সব পর্যটক নিরাপদে সাজেক ছেড়েছেন। তিনি বলেন, পুরো ঘটনা তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইএসপিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বৃহস্পতিবার সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাজেকে ভ্রমণরত প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলাকালে সকাল আনুমানিক ১০টায় গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল পর্যটকদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। আলোচনা চলাকালে, সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় অবরোধকারীরা আকস্মিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জের মাধ্যমে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং পুনরায় পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

পরবর্তী সময়ে সকাল আনুমানিক ১১টায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০-৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। এ সময় সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

এ ধরনের সহিংস কর্মকান্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বিঘিœত করার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিরীহ পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা এবং সাধারণ জনগণকে জোরপূর্বক অবরোধ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও পার্বত্য অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে বলেন, সংবাদ মাধ্যমে বাঘাইছড়ির সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি চলেছে বলে যে খবর প্রচার করা হয়েছে তা মিথ্যা ও বানোয়াট। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘মূলত জেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা বাহিনী এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’ অংগ্য মারমা অবিলম্বে সাজেকাবাসীর ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে ওই এলাকা থেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি যৌথভাবে বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা থেকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। সংগঠন দুটির নেতাদের অভিযোগ, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতি ও তৎপরতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। এসব সদস্যকে এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে তারা আন্দোলন করছেন। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ছয় দিনের জন্য অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছিল। ওই সময়ে পর্যটকদের যাতায়াত স্বাভাবিক করতে প্রশাসন সাজেক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করে। বিরতি শেষে দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে সংগঠন দুটি আবারও অবরোধের ঘোষণা দেয়।

অবরোধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় বুধবার সন্ধ্যায় সাজেক ভ্যালিতে পর্যটক প্রবেশ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে এলাকা ছেড়ে নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নিষেধাজ্ঞার পরদিনই পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার সময় সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা পরিস্থিতির ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।