শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ঘিরে ‘পর্যটন কার্নিভ্যাল’ উপলক্ষে মুখরিত দেশের দুই সমুদ্রসৈকত। দেশের নানাপ্রান্ত থেকে এসেছেন পর্যটকরা। তাদের উপস্থিতিতে কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সেই সঙ্গে বেড়েছে সৈকতকেন্দ্রিক হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁগুলোর ব্যস্ততা। সমুদ্রের ঢেউ আর নির্মল বাতাসে ক্লান্তি দূর করতে আসা সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের উপস্থিতিতে বেড়েছে স্থানীয় কর্মচাঞ্চল্য। প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন
কক্সবাজার : কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রাণকেন্দ্র লাবণী পয়েন্টে সবসময়ই থাকে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়। সৈকতে সাগরের নীল জলরাশির গর্জন আর বিশাল ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার দৃশ্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই আসছেন হাজারো দর্শনার্থী। এই ভিড় কয়েকগুণ বেড়েছে দুর্গাপূজার সঙ্গে যোগ হওয়া দুদিনের সাপ্তাহিক ছুটিতে।
মৃত্যুর মিছিল উপেক্ষা করে সবুজ পাহাড় আর নীল সমুদ্রের টানে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। পুরো সৈকত রূপ নিয়েছে এক উৎসবের নগরীতে। গত বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের হিমছড়ির জাদুঘরসংলগ্ন সমুদ্রসৈকতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৫ যুবকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার মাত্র চার দিন আগে ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকান্ডে দগ্ধ হয়ে মারা যান ১০ জন। নানা দুর্ঘটনায় একের পর এক প্রাণহানির ঘটনাও থামাতে পারেনি পর্যটকের ঢল।
টানা ৫ দিনের সরকারি ছুটির সুযোগে সবুজ পাহাড়, রুপালি বালু, নীল সমুদ্র আর সফেদ ঢেউয়ে মন হারাতে গত ২০ অক্টোবর থেকেই কক্সবাজারে দেশীয় পর্যটকরা আসতে শুরু করেন। হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট কোথাও ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই। মিলছে না দূর-দূরান্ত থেকে কক্সবাজার আসার বাস-ট্রেনের টিকিট।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিন সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, কেউ গলা ছেড়ে গান গাইছেন, কেউ প্রিয়জনের হাত ধরে সমুদ্রের নীল জলরাশি দেখছেন, কেউ ঢেউয়ের তালে গা ভাসাচ্ছেন, কেউ বালুতে আঁকাআঁকি করছেন, আবার কেউ হাঁটুপানিতে দলবেঁধে হাঁটছেন আর ঢেউ এলে খুশিতে লাফিয়ে ঢেউজয়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
দিনাজপুর থেকে আসা মেজবাহ বলেন, সমুদ্রের টানে এসেছি। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করলেও নানা অব্যবস্থাপনাও চোখ এড়ানো যায় না। প্রশ্ন জাগে এসব থেকে পরিত্রাণের জন্য কি প্রশাসনের উদ্যোগ নেই?
সিলেট থেকে আসা মুহিম খান বলেন, সিলেটও পর্যটন জোন। লন্ডনেও ঘুরেছি আমি। কিন্তু এত বাড়তি দাম, এত অব্যবস্থাপনা অন্য কোথাও দেখিনি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এখানে খাবারের দাম ও মানে বিস্তর ব্যবধান। গাড়ি ভাড়া ও রুম ভাড়াও কয়েকগুণ বাড়তি মনে হয়েছে।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, পর্যটক মৌসুম না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা লস গুনছিলেন। কিন্তু পাঁচ দিনের ছুটি আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। কক্সবাজার হোটেল-মোটেল অফিসার্স অ্যাসোশিয়েনের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, শহর ও মেরিন-ড্রাইভ সড়কে ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ৭শর কাছাকাছি রিসোর্ট-হোটেল-কটেজ-ফ্ল্যাট রয়েছে। যেখানে গড়ে এক লাখের চেয়ে অল্প কিছু বেশি পর্যটক থাকতে পারেন। গতকাল কোথাও কোনো রুম খালি ছিল না।
শুধু হোটেল-রিসোর্ট নয়, ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসার বিমান-বাস ও রেলের টিকিটও মিলছে না।
কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার জয়নাল আবেদীন বলেন, টানা ছুটিতে কক্সবাজারগামী যাত্রীর চাপ অনেক বেশি থাকে। এ চাপ সামাল দিতেই বিশেষ ট্রেন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারপরও চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
গ্রিন লাইন পরিবহনের কক্সবাজারের সুপারভাইজার মো. সুলতান বলেন, গত বুধবার থেকেই কক্সবাজার আসার টিকিট নেই।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকের চাপ বেড়েছে। তাদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) : বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ২৩ ও ২৪ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভ্যাল-২০২৬ ঘোষণা করেছে। শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি ও পর্যটন কার্নিভ্যাল ঘিরে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় বেড়েছে পর্যটকের উপস্থিতি। গতকাল বৃহস্পতিবার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ছুটির আমেজে পর্যটকদের এ উপস্থিতি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আশার সঞ্চার করেছে।
তবে পর্যটকদের আগমনে আবাসিক হোটেল-মোটেলগুলোতে দেখা গেছে মিশ্র চিত্র। কোনো কোনো হোটেলে কয়েক দিনের জন্য শতভাগ কক্ষ বুকিং থাকলেও অনেক হোটেল-রিসোর্টে বুকিং কমে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
হোটেল ডি’মোরের পরিচালক জয়নুল আবেদিন জুয়েল বলেন, আমাদের মোট রুম ৫৭টি। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার শতভাগ বুকিং থাকলেও আজ (শুক্রবার) মাত্র ৫০ শতাংশ বুকিং রয়েছে। আবার আগামীকাল শনিবারে কোনো বুকিং নেই। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজার এমজি মোর্শেদ খান বলেন, আমাদের ৪৩টি রুম। আগামীকাল শনিবার পর্যন্ত সব রুমের শতভাগ বুকিং রয়েছে।
পর্যটকদের আগমন কেন্দ্র করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। বিশেষ করে রাখাইনপল্লী মার্কেটসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা।
রাখাইনপল্লী মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মনির পহলান বলেন, কুয়াকাটায় তিন হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। পর্যটন কার্নিভ্যাল ও টানা ছুটি কেন্দ্র করে কেনাকাটা, খাবার এবং বিভিন্ন পর্যটনসেবার চাহিদা বেড়েছে। তিনি বলেন, আশা করছি এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।
গাজীপুর থেকে পরিবার নিয়ে কুয়াকাটায় এসেছেন লায়লা শিরিন। তিনি বলেন, সমুদ্রের ঢেউ, সৈকত আর মনোরম পরিবেশ পরিবারের সবাইকে আনন্দ দিয়েছে। তবে ভাঙন ও সৈকতের গাছগুলো হারিয়ে যাওয়া ও ক্রমশ ছোট হয়ে আসা সৈকতের দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
খুলনা থেকে আসা সাব্বির হোসেন বলেন, ছুটি কাটাতে এসেছি। ভালো লাগছে। তবে খাবারের মান, যাতায়াত ও নিরাপত্তার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, ভালো সেবা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সাশ্রয়ী খরচ নিশ্চিত করা গেলে কুয়াকাটায় আরও বেশি মানুষ বেড়াতে আসবেন।
পর্যটকদের ভ্রমণ নিরাপদ করতে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করছে। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, পর্যটকরা যেন নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে কুয়াকাটা ভ্রমণ করতে পারেন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পর্যটকদের সেবার মান বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
পর্যটন কার্নিভ্যাল ঘিরে কুয়াকাটায় তৈরি হওয়া উৎসবমুখর পরিবেশে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সৈকতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পর্যটনসেবার মান উন্নয়ন অব্যাহত রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।