পবিত্র কোরআন আত্মার প্রশান্তির উৎস। এতে রয়েছে অন্তরের ব্যাধির নিরাময়। মহান আল্লাহ কোরআনে মানুষের অতীত জীবনের কাহিনি এবং পৃথিবীতে ক্ষণস্থায়ী সফরের বিবরণ তুলে ধরেছেন। মানুষ যখন কিছুই ছিল না, তখন থেকে তার সৃষ্টি, আয়ু, মৃত্যু, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং শেষ গন্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ এতে বিবরণ দিয়েছেন।
বিবরণের প্রতিটি স্তরে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন, কোন উদ্দেশ্যে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং কোন কাজের মাধ্যমে তার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য নির্ধারিত হবে। তিনি অতীতের জাতিগুলোর অবস্থা এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলোর পরিণতির কথাও বর্ণনা করেছেন। এসব ঘটনা এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা মুমিনের জীবন চলার পথ নির্ধারণ করে এবং তার নানা প্রশ্নের উত্তর দেয়।
আপনারা কোরআনের সুরা কাফ নিয়ে চিন্তা করুন। নবীজি (সা.) জুমার দিন খুতবা দেওয়ার সময় এই সুরাটি সম্পূর্ণ অথবা এর কিছু অংশ তেলাওয়াত করতেন।
এই সুরার মহান বিষয়বস্তু এবং এর গভীর তাৎপর্যের কারণেই নবীজি (সা.) এমনটি করতেন। এতে একদিকে যেমন সুস্পষ্ট প্রমাণের মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে হৃদয় কাঁপানো উপদেশ। এসব উপদেশ মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলে, চোখকে অশ্রুসিক্ত করে এবং সংকল্পকে শক্তিশালী করে আল্লাহর সরল ও সুদৃঢ় পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।
আল্লাহ এই সুরার সূচনা করেছেন অসাধারণ ভঙ্গিতে। এর সূচনা হৃদয়কে তার মহিমা ও গাম্ভীর্যের সামনে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে এবং বিবেককে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন করে। সুরাটি শুরু হয়েছে হরফে মুকাত্তায়াত দিয়ে। এরপর এসেছে মহান কোরআনের শপথ। শপথের জবাব উল্লেখ না করে বক্তব্যকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা সমগ্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সেটি হলো পুনরুত্থান ও পরকালীন জীবন।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রথমবার সৃষ্টি করতে গিয়ে কি আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম? বরং তারা নতুন সৃষ্টি সম্পর্কে সন্দেহের মধ্যে রয়েছে।’ (সুরা কাফ ১৫)
এরপর সুরাটি সৃষ্টির ওপর আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও ক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরে। এর মাধ্যমে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একসময় শেষ হয়ে আসবে। এরপর শুরু হবে চিরস্থায়ী পরকালীন জীবন। সেখানে থাকবে নানা অবস্থা, ভয়াবহতা ও কঠিন পরিস্থিতি। আর শেষ পর্যন্ত মানুষের এই সফর গিয়ে শেষ হবে চিরস্থায়ী সুখ অথবা চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্যে।
এই প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার মন তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, তা আমি জানি। আমি তার গলার শিরার চেয়েও তার অধিক নিকটবর্তী। যখন ডান ও বাঁ পাশে বসা দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা তার আমল গ্রহণ করে, তখন সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে সদা প্রস্তুত পর্যবেক্ষক রয়েছে।’ (সুরা কাফ ১৬-১৮)
এই আয়াতগুলোতে রয়েছে ইমানি শিক্ষা, বর্ণনার গভীরতা এবং কোরআনের আলোকোজ্জ্বল দিকনির্দেশনা। সুরার শেষাংশে এমন এক উপদেশ এসেছে, যা হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয় এবং মানুষকে নিজের পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের আগে আমি বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, যারা শক্তিতে তাদের চেয়ে প্রবল ছিল। তারা দুনিয়া চষে বেড়াত। তাদের পালানোর কোনো পথ ছিল কি? নিশ্চয়ই এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার অন্তর আছে অথবা যে মনোযোগ দিয়ে শোনে।’ (সুরা কাফ ৩৬-৩৭)
১৬ অক্টোবর শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন হাসান আল মামুন