যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থমকে যাওয়া শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত না হলেও, দুই পক্ষের বাগযুদ্ধ নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যকে ঘিরে পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের ইঙ্গিতের জবাবে ইরান জানিয়েছে, তারা ‘ফাদার অব অল বম্বস’ বা ‘সব বোমার বাবা’ নামে পরিচিত একটি নতুন অস্ত্র উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি গত বুধবার অস্ত্রটি সম্পর্কে বিস্তারিত না জানিয়ে বলেন, ‘আমরা “ফাদার অব অল বম্বস” উন্মোচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্বে রয়েছি। এটি শত্রুর জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক চমক হতে যাচ্ছে’।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো সম্প্রতি জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলে ইরানের সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) দিয়ে আঘাত হানার পরিকল্পনা আছে পেন্টাগনের। প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি বা ২১ হাজার ৬০০ পাউন্ড ওজনের এই বোমা ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত। জিবিইউ-৪৩/বি অস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা অ-পারমাণবিক প্রথাগত বোমার মধ্যে অন্যতম বড় ও শক্তিশালী। ২০১৭ সালের এপ্রিলে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে জঙ্গি সংগঠন আইএসের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে এটি প্রথমবার ব্যবহার করা হয়েছিল। আর এর প্রেক্ষিতেই ‘ফাদার অব অল বম্বস’ উন্মোচনের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
আইআরজিসি নতুন এই অস্ত্রের সুনির্দিষ্ট তথ্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই গোপনে রেখেছে। তবে এর আগে ২০১৭ সালে আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্স তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে ১০ টন ওজনের একটি স্বদেশি প্রথাগত বোমা তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিল। সে সময় তারা দাবি করেছিল, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ৯.৮ টনের এমওএবি এর চেয়েও ভারী ও মারাত্মক ধ্বংস ক্ষমতাসম্পন্ন এবং এটি ইলিউশিন (আইএল-৭৬) কৌশলগত পরিবহন বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালের এই নতুন ঘোষণাটি মূলত সেই প্রকল্পেরই একটি আধুনিক ও উন্নত সংস্করণের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হতে যাচ্ছে। আইআরজিসির মুখপাত্রের দাবি, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ১.৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেননি। তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের গুণগত মানে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে। এদের পাল্লা, ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা এবং লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানার নিখুঁত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে’।
মোহেব্বি জানান, ইরান তার প্রতিরক্ষা নীতি বা সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে, যার মূল লক্ষ্য স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তিনি বলেন, অতীতে ইরানের নীতি ছিল কেবল রক্ষণাত্মক। আমরা বলতাম কোনো দেশ আক্রমণ করলে আমরা কেবল তার জবাব দেব। কিন্তু এখন আমাদের নীতি হচ্ছে কোনো দেশ আক্রমণ করলে আমরা শুধু জবাবই দেব না, বরং সরাসরি পাল্টা আক্রমণ শুরু করব। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো হামলার ক্ষেত্রে ইরান সমমানের পদক্ষেপ নেবে এবং দেশটির সামরিক কৌশল দিনে দিনে আরও বেশি ‘অসম যুদ্ধ’-এর ওপর নির্ভরশীল হবে। ‘আমাদের সামরিক নীতি কেবল আক্রমণাত্মক নয়, এটি হবে অসম। আমরা শত্রুকে এমনভাবে আঘাত করব যাতে তারা আমাদের জবাবের ভয়াবহতা হাড়ে হাড়ে টের পায়’, যোগ করেন মোহেব্বি।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি : ‘অবৈধ’ জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যাহত থাকলে অঞ্চলটিতে থাকা তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো সংঘাতের আওতায় আসবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসির নৌবাহিনী। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মাইন পাতা জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের জোরাজুরি সামুদ্রিক দুর্ঘটনা ও সংঘাতের ঘটনা বাড়িয়ে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী সামরিক বাহিনীকে বুঝতে হবে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোও সংঘাতের আওতায় চলে আসবে। এটি একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
এর আগে আইআরজিসি জানিয়েছিল, উপসাগরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কাজে যুক্ত চারটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে তাদের বাহিনী। এতে জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ সমুদ্রে পাতা মাইনে আঘাত পেয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।