অরুণাচলে ২৩ লাখ গাছ কাটতে বনভূমির ছাড়পত্র চাইল এনএইচপিসি

অরুণাচল প্রদেশে ১ হাজার ৭২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কমলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ৩ হাজার ২৭৮ হেক্টর বনভূমি ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন (এনএইচপিসি)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২৩ লাখ ৪০ হাজারের বেশি গাছ কেটে ফেলতে হতে পারে। হিমালয়ের পাদদেশে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খবর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। 

ভারতের কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কাছে বনভূমি ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছে এনএইচপিসি। মন্ত্রণালয়ের বনভূমি উপদেষ্টা কমিটি ২৩ অক্টোবর এ প্রস্তাব পর্যালোচনা করার কথা রয়েছে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, সুবনসিরি নদীর ডান তীরের উপনদী কমলার পানিপ্রবাহ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য অরুণাচল প্রদেশের ক্রা দাদি, কুরুম কুমে ও কমলে জেলার বনভূমি ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত বনভূমিতে মোট ২৩ লাখ ৪০ হাজার ২১৩টি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ ৮ হাজার গাছ হাপোলি বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় এবং ৮ লাখ ৩১ হাজার গাছ দাদি বন বিভাগের আওতায় পড়েছে। বনভূমি ব্যবহারের অনুমতি মিললে এসব গাছ কাটার প্রয়োজন হতে পারে।

বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের ক্ষতিপূরণ হিসেবে মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জেলায় ৭ হাজার ১৮ হেক্টর জমিতে বনায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভারতের বনভূমি সংরক্ষণবিষয়ক বিধান অনুযায়ী, বনভূমি প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করা হলে সাধারণত সমপরিমাণ অরণ্যবহির্ভূত জমিতে বনায়নের ব্যবস্থা করতে হয়। এ ধরনের জমি পাওয়া না গেলে ক্ষতিগ্রস্ত বা অবক্ষয়িত বনভূমিতে দ্বিগুণ আয়তনের জমিতে বনায়নের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের শিলং আঞ্চলিক কার্যালয়ের সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত এলাকা কোনো জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বা হাতি চলাচলের করিডরের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের জলাধারের বিস্তৃতি বাড়লে বন্যপ্রাণীর এক তীর থেকে অন্য তীরে চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কাজে লাগিয়ে ২১৬ মিটার উঁচু কংক্রিটের গ্র্যাভিটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বাঁধ ও জলাধার-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের কারণে প্রায় ২ হাজার ৯৬০ দশমিক ৪৯ হেক্টর বনভূমি জলমগ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কমলা নদী উপত্যকা পাহাড়ি ও ঘন অরণ্যবেষ্টিত অঞ্চল। প্রকল্পটির সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি বাস্তবায়িত হলে ১২৬টি গ্রামের ৫ হাজার ৪৪০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রস্তাবিত ৩ হাজার ২৭৮ হেক্টর বনভূমির মধ্যে ৪৩৯ হেক্টর অতি ঘন বন এবং ১ হাজার ১১৯ হেক্টর মাঝারি ঘনত্বের বনভূমি। বিভিন্ন ঋতুতে জরিপ চালিয়ে ওই এলাকায় প্রায় ১৫৫ প্রজাতির গাছ শনাক্ত ও নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটি কমলা প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। তবে বনভূমি ব্যবহারের নীতিগত অনুমোদন পাওয়ার শর্তে চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত ছিল।

এখন বনভূমি ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে প্রকল্পটি। অনুমোদন মিললে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বনভূমি, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব মোকাবিলা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।