রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক এখন পর্যটকশূন্য। সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও পর্যটকদের আটকে পড়ার ঘটনায় পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গতকাল নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় প্রায় তিন হাজার পর্যটককে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় স্থানীয় পর্যটন ব্যবসা ও পরিবহন খাতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন পাহাড়ের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে আসছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হলেও দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) থেকে আবারও অবরোধ শুরু হয়।
অবরোধের কারণে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা হয়ে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। গতকাল পর্যটকদের নিজ গন্তব্যে ফিরিয়ে নেওয়ার সময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। পরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পর্যটক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি ছুড়লে আত্মরক্ষার্থে নিরাপত্তা বাহিনীও গুলিবর্ষণ করে।
এদিকে সংগঠন দুটির ডাকে সাজেক সড়কে এখনো অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। তবে শুক্রবার সকাল থেকে সড়কের কোথাও পিকেটারদের অবস্থান দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাজেকের বিভিন্ন পয়েন্টে টহল দিচ্ছে। বর্তমানে সাজেকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
বারবার অবরোধ ও পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, রিসোর্ট-কটেজের মালিক, জিপচালক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতি জানায়, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানে আগাম বুকিং ছিল। কিন্তু পর্যটকদের আগেভাগে ফিরে যেতে হওয়ায় এবং পরবর্তী সময়ের বুকিং বাতিল হওয়ায় ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় জিপচালকদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে।
এ ছাড়া সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটা ও কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
সাজেক পরিবহন কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মো. আরিফ জানান, প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ সাজেকের উদ্দেশে রওনা দিত। তবে পর্যটকদের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বর্তমানে কেউ সাজেকে যেতে পারছেন না।
সাজেক পর্যটন ভ্যালির কুঁড়েঘর রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী যতেন ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ের তিন জেলাতেই আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু অন্য কোথাও সড়ক অবরোধের ডাক দেওয়া হয় না। সাজেক পর্যটনকে কেন্দ্র করে সড়ক অবরোধের ডাক দেওয়াকে তিনি পর্যটন খাতের ক্ষতি করার পাঁয়তারা বলে মনে করেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অবরোধ ও পর্যটন বন্ধের ঘোষণায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, অবরোধের কারণে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যেতে হয়েছে। অনেকে রিসোর্টের আগাম বুকিং বাতিল করেছেন। সড়ক অবরোধের ফলে শুধু পর্যটক ও ব্যবসায়ীরাই নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও চরম ভোগান্তিতে পড়েন। খাদ্যসামগ্রী কেনাকাটা এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া ব্যাহত হয়।
এরই মধ্যে সাজেকের অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সড়ক ও নৌপথে আধাবেলা অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।