কাঠমিস্ত্রির সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল পবিত্র চন্দ্রের। অভাব ঘোচাতে শেষ সম্বল স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করেন। বিভিন্ন এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পাড়ি জমান রাশিয়ায়। স্বপ্ন ছিল বিদেশে কাজ করে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাবেন। কিন্তু কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানেই প্রাণ হারিয়েছেন পবিত্র চন্দ্র। এখন স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার পরিবারের।
পবিত্রের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার মজিদপুরে। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান তিনি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, রাশিয়ায় যাওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তখন জানিয়েছিলেন, তাকে একটি হোটেলে রাখা হয়েছে। কাগজপত্রের কাজ শেষ হলে চাকরি দেওয়ার ছিল গালভরা আশ্বাস। কিন্তু পরে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবারের দাবি, গত ২৯ মে ফোন করে পবিত্র জানান, তাকে আরও সহযোগির সঙ্গে জোর করে পাঠানো হচ্ছে যুদ্ধে, মৃত্যুর শঙ্কা ৯৫ ভাগ।
সেই তার শেষ কথা, এরপর আর কোনো খোঁজ মেলেনি পবিত্রর। পরে বেঁচে ফেরা সঙ্গীদের কাছ থেকে তার স্বজনেরা জানতে পারেন, সম্মুখযুদ্ধে মৃত্যু হয়েছে ভাগ্যহত ওই যুবকের।
শুধু পবিত্র চন্দ্রের পরিবার নয়, গোপালপুরের আরও দুই পরিবারের জীবনেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। উপজেলার আলমনগর ইউনিয়নের বীর নলহরা গ্রামের নজরুল ইসলাম এবং নগদা সিমলা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলামের পরিণতি কী হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানে না তাদের পরিবার।
উপার্জনক্ষম স্বজনদের খোঁজ না পেয়ে দিশেহারা পরিবারগুলো। কেউ ঋণ করে স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়ে এখন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, আবার কেউ প্রিয়জনের বেঁচে থাকা কিংবা মৃত্যুর নিশ্চিত খবরের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, পবিত্র, নজরুল ও আমিনুলের পরিবারের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। কাজের আশায় রাশিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়া ৩০ বাংলাদেশির পরিবারের অবস্থাও প্রায় একই রকম।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গত ১৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে জানায়, জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গত ৭ মে রাশিয়ায় যান ওই ৩০ বাংলাদেশি।
সংস্থাটির অভিযোগ, নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে নেওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের প্রতিশ্রুত চাকরি তো দেয়াই হয়নি, উপরন্তু পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
আরও অভিযোগ, ২১ দিনের সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে পবিত্র-নজরুল-আমিনুলদের পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে। যুদ্ধক্ষেত্রে ওই বাংলাদেশিদের ব্যবহার করা হয়েছিল মানবঢাল হিসেবে। ফলে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ৩০ জনের মধ্যে ১৭ জন মারা যান সম্মুখ যুদ্ধে, পরে মারা যান তিনজন।
এছাড়া দুজন আহত হয়ে রাশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে বাধ্য হচ্ছেন, আর ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশে ফিরতে পেরেছেন দুজন।
কাজের সন্ধানে বিদেশে গিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতায় প্রাণ হারানো এসব মানুষের পরিবার এখন একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে ঋণের বোঝা নিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের পরিবারের অপেক্ষাও শেষ হচ্ছে না।