‘রাজামশাই! রাজামশাই! নদীর ধারে বড় ঝামেলা হয়েছে!’
খরগোশ টুনটুন হাঁপাতে হাঁপাতে সিংহের গুহার সামনে এসে চিৎকার করল।
ভেতর থেকে শুধু একটি বড় হাই
শোনা গেল।
‘হুম... পরে দেখা যাবে...’
এরপর আবার নাক ডাকার শব্দ।
টুনটুন হতাশ মুখে ফিরে গেল। জঙ্গলের রাজা সিংহ শেরু আগে এমন ছিল না। সকালে উঠে পুরো জঙ্গল ঘুরে দেখত। কার কী সমস্যা, সবার কথা শুনত। কিন্তু কিছুদিন ধরে তার ভীষণ অলসতা ধরেছে। খাওয়া, ঘুম আর বিশ্রাম। এই ছিল তার কাজ।
শুরুতে সবাই ভেবেছিল, রাজামশাই হয়তো ক্লান্ত। দু-একদিন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দিন গেল, সপ্তাহ গেল, কিছুই বদলাল না।
ধীরে ধীরে জঙ্গলে অদ্ভুত সব সমস্যা
দেখা দিল।
হাতিরা পানি খেতে এসে দেখল, ছোট প্রাণীরা ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তাদের জন্য জায়গা করে দিচ্ছে না।
বানরগুলো গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে পাকা ফল ছিঁড়ে মাটিতে ফেলে দিচ্ছে। অনেক ফল নষ্ট হচ্ছে।
কাঠবিড়ালিরা বাদাম লুকিয়ে রাখার জায়গা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে।
কেউ কারও কথা শুনছে না।
সবাই একটাই কথা বলে, ‘রাজামশাইকে বলো।’
কিন্তু রাজামশাইকে পাওয়া যায় কোথায়?
তিনি তখন ঘুমাচ্ছেন।
একদিন সকালে টুনটুন খরগোশ সিদ্ধান্ত নিল, এভাবে আর চলতে পারে না।
সে একে একে সবাইকে ডাকল।
হরিণ, কাঠবিড়ালি, টিয়া, কচ্ছপ, বানর, এমনকি ছোট্ট ইঁদুরও এলো।
টুনটুন বলল, ‘আমরা যদি শুধু অভিযোগ করি, তাহলে তো কিছুই হবে না। আগে আমরা নিজেরা চেষ্টা করি।’
সবাই মাথা নাড়ল।
সেদিন থেকেই তারা ছোট ছোট দায়িত্ব ভাগ করে নিল।
কচ্ছপ নদীর ধারে শৃঙ্খলা দেখবে।
টিয়া খবর ছড়িয়ে দেবে।
কাঠবিড়ালিরা নষ্ট হওয়া ফল কুড়িয়ে এক জায়গায় রাখবে।
হরিণ ছোট প্রাণীদের আগে পানি খেতে সাহায্য করবে।
সবাই কাজ শুরু করল।
দুই দিন বেশ ভালোই চলল।
কিন্তু তৃতীয় দিনেই নতুন বিপদ।
বানরদের একটি দল বলল, ‘আমরাই জঙ্গলের সবচেয়ে চটপটে। তাই ফল আগে আমরা খাব!’
হরিণ বলল, ‘কিন্তু সবাইকে ভাগ দিতে হবে।’
এক বানর মুখ বাঁকিয়ে বলল, রাজামশাই আমাকে বলেছেন, যত খুশি ফল খেতে!
টুনটুন অবাক হয়ে বলল, ‘সত্যি?’
বানরটি খুব জোরে মাথা নাড়ল।
‘অবশ্যই!’
কিন্তু তখনই গাছের ডালে বসে থাকা বুড়ো টিয়া হেসে উঠল।
‘আমি তো সারা দিন রাজামশাইয়ের গুহার কাছে ছিলাম। তিনি কাউকে কিছুই বলেননি। শুধু ঘুমিয়েছেন।’
বানরটি চুপ করে গেল।
সবাই বুঝল, নিজের সুবিধার জন্য বানর মিথ্যা বলেছে।
একটু পরে মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি ভুল করেছি। আমি ভেবেছিলাম, সবাই বিশ্বাস করবে।’
টুনটুন হেসে বলল, ‘সত্যি বলেছ, এটাই ভালো। এবার চল, সবাই মিলে ফল ভাগ করি।’
বানরটিও হাসল।
সে নিজেই সবচেয়ে মিষ্টি ফলগুলো ছোট প্রাণীদের হাতে তুলে দিল।
সেদিন বিকেলে শেরু সিংহের ঘুম ভাঙল।
গুহার বাইরে এসে সে অবাক হয়ে গেল।
জঙ্গল অনেকটাই শান্ত।
সবাই ব্যস্ত।
কেউ ঝগড়া করছে না।
কেউ চিৎকার করছে না।
সে টুনটুনকে ডেকে বলল, ‘এত শান্ত কেন?’
টুনটুন সব ঘটনা খুলে বলল।
শেরু চুপচাপ শুনল।
তারপর ধীরে ধীরে নদীর ধারে গেল।
দেখল, প্রাণীরা নিয়ম মেনে পানি খাচ্ছে।
ফলের বাগানে গিয়ে দেখল, ফল নষ্ট হচ্ছে না।
সবাই হাসিমুখে কাজ করছে।
শেরুর বুকটা হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল।
সে বুঝতে পারল, শুধু রাজা হওয়াই যথেষ্ট নয়। রাজাকে সবার পাশে থাকতে হয়।
সে লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আমি অনেক দিন নিজের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করিনি। তোমরা কষ্ট পেয়েছ।’
জঙ্গলের প্রাণীরা অবাক হলো।
রাজামশাই নিজের ভুল স্বীকার করছেন!
টুনটুন এগিয়ে এসে বলল, ‘আপনি যদি এখন থেকে আমাদের সঙ্গে থাকেন, তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
শেরু হেসে মাথা নাড়ল।
পরদিন ভোরে সবাই অবাক হয়ে দেখল, রাজামশাই অনেক আগে উঠে পড়েছেন।
তিনি নদীর ধারে গেলেন।
তারপর বনের পথ ঘুরে দেখলেন।
যেখানে ছোট সমস্যা, সেখানেই দাঁড়িয়ে কথা শুনলেন।
বানরদের বললেন, ‘ফল গাছে থাকলে আরও পাকে। যতটুকু দরকার, ততটুকুই নাও।’
হাতিদের বললেন, ‘ছোটদের জন্য একটু জায়গা ছেড়ে দাও।’
সবাই আনন্দের সঙ্গে তার কথা শুনল।
কারণ তিনি শুধু নির্দেশ দিচ্ছিলেন না, নিজেও পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলেন।
একদিন বিকেলে টুনটুন দেখল, শেরু নিজেই শুকনো ডাল সরিয়ে পথ
পরিষ্কার করছেন।
টুনটুন হেসে বলল, ‘রাজামশাই, এটা তো অন্য কেউও করতে পারত।’
শেরু মুচকি হেসে বললেন, ‘যে কাজ অন্যের কাছে চাই, সেই কাজ নিজে শুরু করলে সবাই আরও আগ্রহ পায়।’
কথাটা শুনে বানর, হরিণ, কাঠবিড়ালি, টিয়া সবাই এগিয়ে এলো।
অল্প সময়েই পথ পরিষ্কার হয়ে গেল।
সন্ধ্যায় জঙ্গলে আবার হাসির শব্দ ভেসে উঠল।
পাখিরা গান গাইল।
নদীর জল টুপটাপ শব্দে বয়ে চলল।
শেরু আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, ঘুম খুব মজার। কিন্তু সবার মুখে হাসি দেখতে পাওয়া তার চেয়েও অনেক বেশি আনন্দের।
সেদিন থেকে জঙ্গলে আর বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি।
কারণ সবাই জানত, ভালো নেতা শুধু সিংহাসনে বসে থাকেন না। তিনি সবার সঙ্গে পথও হাঁটেন। আর যখন সবাই সত্য কথা বলে, নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়, তখন ছোট্ট একটি জঙ্গলও সুখে-শান্তিতে ভরে ওঠে।