স্থায়ী বাঁধ নিয়ে শঙ্কা

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূল সুরক্ষায় ৪৯৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬ দশমিক ৪১০ কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ কাজ চলছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এর অগ্রগতি মাত্র ৩০ শতাংশ বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে জনমনে সংশয়ের পাশাপাশি বাঁধ নির্মাণে সাগরের লবণাক্ত বালি ও নিম্নমানের পাথর ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে খানখানাবাদে ২ হাজার ৬১০ কি.মি., বাহারছড়ায় ১ হাজার কি.মি., ছনুয়ায় ২ হাজার ৮০০ কি.মি. এবং সাধনপুরে ১ হাজার ১০০ কি.মি. নদীতীর সংরক্ষণের এই কাজ চলমান রয়েছে। তবে বারবার একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়ায় পুরো প্রকল্পটিতে নানা অনিয়ম ও অসংগতি দেখা দিয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২০১৫ থেকে ২০১৮ মেয়াদের আগের প্রকল্পেও নানা অজুহাতে ও ঠিকাদারদের চাপে বাজেট ২০৯ কোটি থেকে দফায় দফায় বাড়িয়ে ২৯৩ কোটি টাকা করা হয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বাঁধ স্থায়ী হয়নি। এবারও আগের বিতর্কিত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ায় অতীতে যেভাবে বারবার সময় ও বিল বাড়িয়ে সরকারি অর্থের অপচয় করা হয়েছে, এবারও সেই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন।

চলমান প্রকল্পের শুরুতেই স্থানীয়দের সাব-ঠিকাদারি ও বালি সরবরাহের দাবি, ব্লকে লবণাক্ত বালির ব্যবহার এবং প্রশাসনের অভিযানে জরিমানার ঘটনা ঘটেছে। ফলে বিগত বছরগুলোর মতোই এবারও কাজের মান নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করছেন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। তদারকির অভাব আর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছেÑ উপকূলবাসীর জীবন-মরণ এই বাঁধ নিয়ে অনিয়মের খেলা কবে শেষ হবে?

ছনুয়ার চলমান ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটারের কাজ প্রসঙ্গে ছনুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল হক চৌধুরী জানান, ‘বন্যাসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিল। আমি নিজে প্রকল্প এলাকায় না গেলেও শুনেছি পাথর ও বালি সিলেট থেকে আনা হচ্ছে। তবে জিওটিউব ও জিওব্যাগের জন্য কুতুবদিয়া চ্যানেল থেকে বালি নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা কেবল শ্রমিকের কাজ করছে, বাকি মূল কাজ ঠিকাদারের নিজস্ব লোকজনই করছে।’

খানখানাবাদের বাসিন্দা আবুল কালাম, ‘রশিদ আহমদ ও নজরুল ইসলামসহ অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাঁশখালীর এই বেড়িবাঁধ উপকূলবাসীর বেঁচে থাকার লড়াই। প্রতি বছর বাঁধ ভেঙে ৮টি ইউনিয়নের মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থসিদ্ধি হলেও চরম ক্ষতির মুখে পড়ছে সাধারণ জনগণ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা উপস্থিত না থাকায় ঠিকাদাররা নিজেদের ইচ্ছেমতো নিম্নমানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রাম পাউবো উপ-বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, ‘কাজের শতভাগ স্বচ্ছতা ও সঠিক তদারকি নিশ্চিত করতে মাঠে আমাদের ১ জন এসডিই, ৩ জন এসও, ৩ জন কার্যসহকারী, ১ জন সার্ভেয়ার এবং ৩ জন আউটসোর্সিং সদস্যসহ মোট ১১ জনের একটি দল নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছে।’

বাঁশখালীতে চলমান প্রকল্পে খানখানাবাদ ইউনিয়নে ২ হাজার ৬১০ কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ কাজ ওয়েস্টান, পিডিএল (জেবি), কেএসএ-জামিল ইকবাল (জেবি), এইচবি, এনটি(জেবি) ঠিকাদার, বাহারছড়া ইউনিয়নে ১ হাজার কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ কাজ এইচবি, এনটি (জেবি) ঠিকাদার, ছনুয়া ইউনিয়নে ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ কাজ পিডিএলও আরএফএল ঠিকাদার, এবং সাধনপুর ইউনিয়নে ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ আরএফএল ওএইচবি-টিআই জেবি ঠিকাদার বাস্তবায়ন করছে।

ছনুয়াতে বেড়িবাঁধের কাজের অগ্রগতি দেখতে গিয়ে পিডিএল এর ছনুয়ার সাইট অফিসে কর্মরত এপিও মিরাজ বলেন, আমাদের কাজের যে পরিমাণ ব্লক প্রয়োজন তার অধিকাংশ তৈরি করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এসে তৈরি ব্লকগুলো টেস্ট করে ওকে করলে সেগুলো বাঁধে দিয়ে বাকি ব্লকগুলো তৈরি করা হবে বলে জানান।’

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রামের বাঁশখালী পানি উন্নয়ন উপ-বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, বাঁশখালীতে চলমান বেড়িবাঁধের কাজ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসারে বাস্তবায়ন ও মান রক্ষা করা হবে তবে কাজের এখনো পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ৩০ ভাগ বলে তিনি জানান।