ডা. মো. সাইদুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, চিফ কনসালট্যান্ট রি-অ্যাক্টিভ ফিজিওথেরাপি সেন্টার, ঢাকা।
প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব স্পাইন বা মেরুদন্ড দিবস পালিত হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘Spine Health for Life’, যার বাংলা অর্থ ‘সারাজীবনের জন্য মেরুদন্ডের সুস্বাস্থ্য’। মেরুদন্ড আমাদের শরীরকে সোজা রাখতে, চলাফেরা করতে এবং মেরুরজ্জু বা স্পাইনাল কর্ডকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকা, ভুলভাবে ভারী বস্তু তোলা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বয়সজনিত পরিবর্তন ও দুর্ঘটনার কারণে মেরুদন্ডে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। দৈনন্দিন কাজে প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর বিরতি নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা এবং শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করা উচিত।
মেরুদন্ডের সাধারণ সমস্যা
ডিস্ক হার্নিয়েশন বা ডিস্ক প্রলাপস
মেরুদন্ডের দুটি কশেরুকার মধ্যবর্তী নরম ডিস্কের বাইরের আবরণ দুর্বল হয়ে ভেতরের অংশ বেরিয়ে এলে তাকে ডিস্ক হার্নিয়েশন বলে। এতে ঘাড় বা কোমরে ব্যথা এবং স্নায়ু আক্রান্ত হলে হাত-পায়ে ব্যথা, ঝিনঝিন বা অবশভাব হতে পারে। শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনে এমআরআই করা হয়। রোগের তীব্রতা অনুযায়ী ওষুধ, ফিজিওথেরাপি ও ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগী সুস্থ হন।
কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন
হতে পারে।
স্পাইনাল ক্যানেল স্টেনোসিস
মেরুদন্ডের স্নায়ু চলাচলের নালি সরু হয়ে গেলে তাকে স্পাইনাল ক্যানেল স্টেনোসিস বলে। এতে কোমর বা ঘাড়ে ব্যথা, হাত-পায়ে অবশভাব, দুর্বলতা কিংবা হাঁটার সময় পায়ে ব্যথা হতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় ওষুধ, ফিজিওথেরাপি ও ব্যায়ামে উপকার পাওয়া যায়। গুরুতর স্নায়বিক সমস্যা হলে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
স্পনডাইলোসিস
বয়সের সঙ্গে মেরুদন্ডের ডিস্ক, জয়েন্ট ও হাড়ে ক্ষয়জনিত পরিবর্তন হলে তাকে স্পনডাইলোসিস বলে। ঘাড়ে হলে সারভাইক্যাল এবং কোমরে হলে লাম্বার স্পনডাইলোসিস বলা হয়। এতে ব্যথা ও শক্তভাব দেখা দিতে পারে। চিকিৎসায় ওষুধ, ফিজিওথেরাপি এবং নিয়মিত ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ। ভারী বস্তু তোলার সময় হাঁটু ভাঁজ করে তুলতে হবে এবং কোমরে অতিরিক্ত মোচড় দেওয়া এড়াতে হবে।
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি
সড়ক দুর্ঘটনা, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া বা দুর্ঘটনার কারণে মেরুরজ্জু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে হাত-পায়ে দুর্বলতা, অনুভূতি হারানো বা পক্ষাঘাত দেখা দিতে পারে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার এবং পরবর্তী ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন রোগীর কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
স্কোলিওসিস
মেরুদন্ড একদিকে অস্বাভাবিকভাবে বাঁকা হয়ে ‘ঝ’ বা ‘ঈ’ আকৃতি ধারণ করলে তাকে স্কোলিওসিস বলে। এতে কাঁধ বা কোমরের দুই পাশ অসমান দেখা যেতে পারে। রোগের মাত্রা অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ, ব্রেস, নির্দিষ্ট ব্যায়াম বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
স্পাইনাল টিবি
মেরুদন্ডে যক্ষ্মার সংক্রমণ হলে দীর্ঘস্থায়ী পিঠব্যথা, জ¦র, ওজন কমে যাওয়া এবং দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসায় নির্ধারিত যক্ষ্মাবিরোধী ওষুধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্নায়ুর ওপর চাপ বা মেরুদ-ের অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে অস্ত্রোপচার লাগতে পারে। পুনর্বাসনও রোগীর কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক।
মেরুদন্ড সুস্থ রাখতে
বসার সময় পিঠে যথাযথ সমর্থন দিন এবং কম্পিউটারের পর্দা চোখের সমতলে রাখুন। প্রতি ৩০-৪৫ মিনিট পর উঠে হাঁটুন বা শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করুন। নিয়মিত হাঁটা ও উপযুক্ত ব্যায়াম করুন। ভারী বস্তু তোলার সময় হাঁটু ভাঁজ করুন; হঠাৎ কোমর মোচড়াবেন না। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সতর্ক থাকুন। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অবশভাব বা দুর্বলতা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।