রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে তিন কৌশলে সরকার

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের (গ্র্যাজুয়েশন) পর বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় রপ্তানি সক্ষমতা ও শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে তিন কৌশল বাস্তবায়নে জোর তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। এর মধ্যে বিদ্যমান সুবিধা ধরে রাখতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ, সেপা, পিটিএ সম্পন্ন করা; প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের কাছ থেকে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধার সর্বোচ্চ ক্রান্তিকাল বা মেয়াদ বাড়ানো এবং জিএসপি প্লাসের মতো এলডিসি বহির্ভূত স্কিমের কমপ্লায়েন্স শর্ত পূরণে জাতীয় মান অবকাঠামো তৈরি (এনকিউআই), মান যাচাই ও সনদ প্রদানের সক্ষমতার উন্নয়ন। 

গত ৭ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত এক অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০টি দেশ ও অর্থনৈতিক জোটের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) করতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। একইসঙ্গে ৩৮টি সম্ভাব্য অংশীদার দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এসব কৌশল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে উত্তরণ তিন বছর পেছানোর প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ তিন বছরেই সরকার উত্তরণ পরবর্তী সময়ে কীভাবে রপ্তানি বাণিজ্যে সক্ষমতা ধরে রাখা ও শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায় করা যায় তারও চূড়ান্ত রোডম্যাপ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। যাকে বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখার কৌশল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। 

তিন কৌশলের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পূরক কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ, শুল্ক প্রত্যর্পণ ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা স্বয়ংক্রিয় করা, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্য প্রসার কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো এবং চলতি বছরের মধ্যে নগদ প্রণোদনানির্ভর রপ্তানি সহায়তা থেকে পর্যায়ক্রমে ডব্লিউটিওর বিধিসম্মত বিকল্প সহায়তা ব্যবস্থায় সরে আসা।

ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কমার্শিয়াল কাউন্সিলরদের কাজে লাগিয়ে ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক গন্তব্যের বাজার সম্ভাবনা, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা, প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান এবং বাংলাদেশের করণীয় ঠিক করতে কাজ শুরু করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেসব দেশের বাজারকে নতুন পণ্যের রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে অনুসন্ধান শুরু করেছে তার মধ্যে রয়েছে কোরিয়া, চায়না, মালয়শিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ইউএই, ইরান, তুরস্ক, কানাডা, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং রাশিয়ার মতো বড় বড় অর্থনীতির দেশ।

 তৈরি পোশাকের বাইরে এসব বাজারে মেডিসিন, ফার্নিচার, খেলনা, বাইসাইকেল, রেফ্রিজারেটর, ফুটওয়্যার, চা, ফল, সবজি, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালাল খাদ্য, উচ্চমূল্যের পোশাক পণ্য, হিমায়িত বা তাজা মাছ, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিকস, প্লাস্টিক পণ্য উল্লেখযোগ্য।

এর সঙ্গে রয়েছে চলমান উদ্যোগ। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ১৯ দেশের আঞ্চলিক জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি বা আরসেপ) যোগ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি বড় রপ্তানি গন্তব্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এখন পর্যন্ত জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (ইপিএ) চুক্তি করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে করা হয়েছে সমন্বিত অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা)। সেপা নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড ও তুরস্কের সঙ্গে শুরু হয়েছে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তির আলোচনাকে। এই চুক্তির আলোচনাকে ফলপ্রসূ করতে সরকার ইতিমধ্যেই তাদের পাঠানো বেশ কিছু সমস্যার দ্রুত সমাধানে মনোযোগী হয়েছে। চুক্তি হয়েছে এয়ারবাসের বিমান কেনার।

এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (সাফটা) আওতায় তৃতীয় পর্যায়ে সদস্য দেশসমূহের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের তালিকা আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এদিকে সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে ২০২৯ সাল পর্যন্ত অগ্রাধিকারভিত্তিক বাণিজ্য সংস্কারের একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে। এই সংস্কারকে দ্রুত ফলদায়ী পদক্ষেপ, মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ এবং ক্রান্তিকালীন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতাবিষয়ক পদক্ষেপ হিসেবে ভাগ করা হয়েছে। দ্রুত ফল পাওয়া যাবে এমন পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং ব্যবসা সহজীকরণ অগ্রগতি। কাস্টমস, বন্দর, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে পুরোপুরি জাতীয় সিঙ্গেল উইন্ডোর সঙ্গে যুক্ত করা, এফটিজেড প্রতিষ্ঠা, জাতীয় ইএসজি কমপ্লায়েন্স কাঠামো, দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ (আরবিসি) নির্দেশিকা ও কার্বন মার্কেট নীতি গ্রহণ উল্লেখযোগ্য।

মধ্যমেয়াদে সরকার বাণিজ্য সহজীকরণের সঙ্গে লজিস্টিকস সংস্কারে মনোযোগ দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ডব্লিউটিওর টিএফএ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় লজিস্টিকস নীতি ২০২৫ কার্যকর করা। তৃতীয় ধাপে গুরুত্ব পাচ্ছে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বাজারে প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত সংস্কার।

বাণিজ্য সংক্রান্ত উত্তরণ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার মূল্যায়নও তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটার কথা থাকলেও তা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ। এই তিন বছরে মসৃণ উত্তরণ কৌশলের আলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মপরিকল্পনা ও কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ জন্য মসৃণ, টেকসই ও অপরিবর্তনীয় এলডিসি উত্তরণের জাতীয় রোডম্যপ (২০২৬-২৯) গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এই রোডম্যাপটি আবার ৫টি রূপান্তরমূলক স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো। এর মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য রূপান্তর, বাজারে প্রবেশাধিকার ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, উৎপাদন সক্ষমতা ও অবকাঠামো, মানবসম্পদ ও দক্ষতা এবং সুশাসন ও অংশীদারত্ব। যা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর আওতায়ই এফটিএ, পিটিএ, সেপা-সহ নানা পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামে (ইআরএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পেছানোর বিষয়ে চলতি অক্টোবরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসবে। বাড়তি সময়কে প্রস্তুতির কাজে লাগাতে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে সরকার। লক্ষ্য রয়েছে উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ করার।

উত্তরণ পেছানোর প্রক্রিয়ার অগ্রগতি তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ধাপ বাংলাদেশ পার করেছে। এরপর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) তিন বছর সময় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও বাংলাদেশের বাড়তি সময় পাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে ইইউর সঙ্গে এফটিএ’র জন্য প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে। একইসঙ্গে ইইউর বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও চলবে। এ সময় তিনি আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসেপ) যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান।

বাইরে ব্যবসা ধরে রাখার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে ব্যবসা শুরুর দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও প্রাথমিক ছাড়পত্র নেওয়ার পর আমদানি নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করে যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা পর্যন্ত গড়ে ৩৫৫ দিন লেগে যায়। এত সময় ব্যয় হলে উদ্যোক্তার উদ্যম ধরে রাখা কঠিন। মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে লাইসেন্স নেওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে ফি পৌঁছে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে।