বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে নতুন প্রস্তাব

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক বিকল্প প্রস্তাব এসেছে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির আলোচনায়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সংসদের উচ্চকক্ষের ভূমিকা, স্পিকার বা উচ্চকক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সম্ভাবনা। একই সঙ্গে উচ্চকক্ষের গঠন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার এখতিয়ার নিয়েও মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে মিডিয়া সেন্টারে এসব তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে সংবিধানে সর্বজনগ্রাহ্য সংশোধনী খসড়া প্রণয়ন, সার্বিক সংস্কার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আইন বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামত ও পরামর্শ দেন।

জানা গেছে, বৈঠকে কেয়ারটেকার গভর্মেন্ট কি ফর্মে গঠন করা হবে, সেটি নিয়ে মতামত এসেছে। এ ছাড়া নির্বাচনব্যবস্থা ও আর্টিক্যাল ৭০ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বৈঠকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। প্রায় ৬০ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের অনেকে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। অন্যরা আগামী এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে লিখিত মতামত দেবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোর মধ্যে এই দিনের আলোচনা সবচেয়ে সমৃদ্ধ ছিল। বিশেষজ্ঞরা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব, বিচার বিভাগের পর্যালোচনার ক্ষমতা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার, সংবিধান সংশোধন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে মতামত দিয়েছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠনপ্রক্রিয়া, কাঠামো ও কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি। তিনি জানান, বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ প্রস্তাব করেছেন, সংসদের উচ্চকক্ষ যদি নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে বিলুপ্ত না হয়, তাহলে উচ্চকক্ষের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা রাখা যায় কি না। এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্টকে দায়িত্ব দেওয়া অথবা সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে নির্বাচিত স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে। এ ছাড়া স্পিকার ছাড়া অন্য ব্যক্তিদের সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের বিধান রাখার বিষয়েও মতামত এসেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব প্রস্তাব কমিটি পর্যালোচনা করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশ্লিষ্টদের লিখিত মতামত দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। সব প্রস্তাব বিবেচনার পর প্রতিবেদনে বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।

উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্যের সংখ্যা পাঁচজন থেকে বাড়ানো এবং সদস্য নির্বাচনের মানদণ্ড নির্দিষ্ট করার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অন্য দেশের সংবিধানের উদাহরণ টেনে কেউ কেউ বলেছেন, উচ্চকক্ষে রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদণ্ড থাকা দরকার। শিল্প, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখা ব্যক্তিদের মধ্য থেকে সদস্য মনোনয়নের বিধান রাখা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও ভিন্নমত এসেছে বলে জানান তিনি।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনায় সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়ে মতামত এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, অনাস্থা প্রস্তাব এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিশেষ পরিস্থিতি এই চারটি বিষয় ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত ও ভোট দিতে পারবেন এমন ধারণার বাইরে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো প্রস্তাব আসেনি। এ বিষয়ে কমিটির আগের আলোচনার সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের মিল রয়েছে। তবে কমিটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকর করা, বিচারক নিয়োগের আইন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশে ভুলত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে সংসদীয় কমিটিসংক্রান্ত বিধান নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে যেভাবে ঐকমত্য হয়েছে, সে অনুযায়ী বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং কিছু সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের গঠন ও কর্মপরিধি নিয়েও বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়া ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আবারও আহ্বান জানান কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে প্রতিটি বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাদের মতামত ও প্রস্তাব পেলে কমিটি সেগুলো বিবেচনা করতে পারবে।

নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত প্রত্যাহার কিংবা শিথিল করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কমিটি এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিরোধী দল কোন কোন বিষয়ে ভিন্নমত শিথিল করতে চায়, তা কমিটিতে এসে জানাতে হবে।

 ২০১১ সালের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তির প্রসঙ্গেও সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সে সময় সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটির অনেক সদস্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তারা সেটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তেসম্মত হন।

বর্তমান প্রক্রিয়ায় নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে সিদ্ধান্তের প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল চাইলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিন্নমত শিথিল করা যেতে পারে, সে বিষয়ে তাদের প্রস্তাব দিতে হবে। কমিটি সেগুলো বিবেচনা করতে পারে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং এর সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়ে বিরোধী দলের দাবির প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

তিনি বলেন, গণভোটের ম্যান্ডেটকে সরকার সম্মান করে। তবে গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা হয়নি। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ওই অধ্যাদেশের ভিত্তিতে আর কোনো ভোট হওয়ার কথা নেই। ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের পর গণভোট হলে তা সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বীকৃত প্রক্রিয়ায় হবে।

সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির কাছ থেকে সর্বোচ্চ অর্জন আশা করছেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। কমিটির বৈঠক থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আশা করব যে সংবিধান যে পর্যায়ে আছে, এখন তার চেয়ে যেন আমরা অনেক অ্যাডভান্সড একটা সংবিধান পাই। এবং যতটুকু অর্জন হবে সেটাই আমাদের লাভ। তবে আমরা চাই সর্বোচ্চ অর্জন যেন হয়।

সংবিধান সংশোধন কমিটি ইতিমধ্যে রাজনীতি দল ও জোট, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক, বিশিষ্ট নাগরিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা, নারী নেতৃত্ব, গণঅভ্যুত্থানের অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। গতকালের বৈঠকে সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আইনজীবী শাহদীন মালিক ও মাহবুব উদ্দিন খোকন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানসহ প্রায় ৪৪ জন বিশেষজ্ঞ অংশ নেন।