বিধিনিষেধের মধ্যেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে গতকাল শনিবার ফের বিক্ষোভ শুরু করেছে শ্রমিক ইউনিয়নসহ শিক্ষার্থী ও তরুণদের বিভিন্ন সংগঠন। বিক্ষোভ চলাকালে ১ হাজার জনকে গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র জব্দ করে দেশটির পুলিশ।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, জব্দ করা সামগ্রীর মধ্যে ছিল ধাতব বল, সিসার গুলি, আতশবাজি, গুলতি, স্টিলের বল, দেশীয়ভাবে তৈরি অস্ত্র, একটি কাতানা (জাপানি তলোয়ার) এবং এয়ারসফট অস্ত্র।
তবে ‘বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি’ বলে জানান তিনি। প্যারিস অঞ্চলে এক হাজারের বেশি তল্লাশি চালানোর কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এর আগে সহিংসতা ঠেকাতে সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর ৭০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়।
দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিওঁতে ‘বিক্ষোভ নিষিদ্ধ’ এমন একটি এলাকায় প্রায় দেড়শ মানুষ জড়ো হন। একপর্যায়ে তারা স্থানীয় একটি পুলিশ স্টেশনের কাছে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে টিয়ার গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। ঘটনাস্থলে সাঁজোয়া যান ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভ শুরুর পরপরই নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে ইয়েলো ভেস্টস সংগঠন। তারা আগামী ৩১ অক্টোবর শনিবার সংসদ ভবনসহ দেশজুড়ে সিটি হলগুলোর সামনে সমাবেশ এবং অবস্থান কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। আট বছর আগে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর বিরুদ্ধে সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আলোচনায় আসা এ সংগঠনটি জানায়, তারা পুলিশের নির্দেশ মানবে না।
রাজধানী প্যারিসে শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মিছিলের অনুমোদিত পথ নিয়ে শ্রমিক সংগঠন ও প্রশাসনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বাস্তিল থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত প্রচলিত পথে মিছিল করার প্রস্তাবের পরিবর্তে প্রশাসন পোর্ত দ্য ভিনসেন থেকে পোর্ত দিতালি পর্যন্ত বিকল্প পথ নির্ধারণ করে।
অন্যদিকে, প্যারিসের দক্ষিণে ওর্লেয়াঁ শহরে লা পেনের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালির (আরএন) বার্ষিক সম্মেলনের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ করেছে অন্তত ১১ হাজার মানুষ। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ও বিরোধীদলীয় নেত্রী লা পেন দুজনেরই সমালোচনা করেন। এ সম্মেলন থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারাভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে লা পেনের। অর্লেয়াঁর কর্মসূচি থেকে বোঝা যায়, ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষাব্যবস্থার মতো সামাজিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদও জন আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশজুড়ে শত শত কর্মসূচির পরিকল্পনা :
শনিবার দেশজুড়ে সাত শতাধিক কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ শতাধিক মিছিলের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন শহরের সড়ক, গোলচত্বর, রেলস্টেশন, সেতু, বন্দর ও টোল আদায়ের স্থানে কর্মসূচি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে ঘোষিত সব কর্মসূচি বাস্তবে অনুষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন শহরে প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে সমাবেশ আয়োজন করা হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু এলাকায় বিক্ষোভ সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়।
লিওঁ শহরে আগের সপ্তাহের আন্দোলনে দেড় শতাধিক দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়। অন্য শহরেও আগের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সতর্কতা জারি করা হয়।
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত দেশজুড়ে ১৩৬টি জনসমাগম বা সড়ককেন্দ্রিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সময় পর্যন্ত বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ হাজার।
গত ১৭ অক্টোবরের আন্দোলনে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় প্রশাসন বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের ঘোষণা অনুসারে শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারম মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে হেলিকপ্টার ও সাঁজোয়া যান। এর আগে সপ্তাহের আন্দোলনে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন প্রায় ৬০ হাজার সদস্য। এ ছাড়া, জাদুঘরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বন্ধ, বিভিন্ন শহরে বিধিনিষেধ আরোপ এবং কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে কারফিউও জারি করা হয়েছে।
ফ্রান্সে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও বাসাভাড়ার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়ের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে বেতন বৃদ্ধি, ন্যূনতম মজুরি ও পেনশন পুনর্মূল্যায়ন, সামাজিক সহায়তা বাড়ানো এবং সরকারি পরিষেবায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, শুধু বেতন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং আয়বৈষম্য কমাতেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকস্বল্পতা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির অনিশ্চয়তা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবির মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষকস্বল্পতা দূর করা, অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে দ্রুত বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানো। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট কমানো এবং শিক্ষা গ্রহণের সুযোগে বৈষম্য দূর করার দাবিও উঠেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রচলিত ব্যবস্থাকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর মতে, ভর্তি প্রক্রিয়ার মানদণ্ড আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকার ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আগামী দিনগুলোতে সরকারের ঘোষিত প্রস্তাব এবং শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর পরবর্তী কর্মসূচি পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শনিবারের বিক্ষোভ আন্দোলন ফ্রান্সের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের অসন্তোষের প্রতিফলন। জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষার মান, বেতন, আবাসন এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের উদ্বেগ আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, এসব সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। অন্যদিকে, সরকারের জন্য শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং জনসাধারণের দাবির বিষয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ।