চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ত্রিপুরা পল্লীতে এখনো পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো। চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আবদুর রহমান সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান, সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ের কোলঘেঁষা ঘরগুলো নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ে; সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন জীবন ঢেকে যায় নিবিড় অন্ধকারে।
এমন চিত্র তুলে ধরেছেন চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আবদুর রহমান। তার অফিসিয়াল ফেসবুক আইডি 'Uno Chandanaish' থেকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই তথ্য জানান।
পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, অন্ধকারের ওপারে আলোধোপাছড়ি ত্রিপুরা পল্লীর একটুকরো জীবনকথা
এখনো সেই পল্লীতে বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি। সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ের কোলঘেঁষা ঘরগুলো নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ে; সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে যেন জীবনও ঢেকে যায় এক নিবিড় অন্ধকারে। যে কয়টি পরিবারের সামর্থ্য আছে, তারা সোলার প্যানেল বসিয়ে বৈদ্যুতিক বাতির ক্ষীণ আলো জ্বালিয়েছে—সেই আলো যেন অন্ধকারের বিরুদ্ধে ছোট্ট এক প্রতিবাদ।
কিন্তু জ্ঞানের আলোর সন্ধানে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের হাঁটতে হয় প্রায় দুই ঘণ্টা। পাহাড়ি পথ, ভেজা মাটি, কখনো কাঁটাঝোপ—সব পেরিয়ে তারা স্কুলে যায়। বইয়ের পাতায় আলো খোঁজে তারা, যেখানে ঘরে ঘরে আলো জ্বালানোর সাধ্য নেই। রাতের পড়াশোনা তাদের কাছে এক দূরের স্বপ্ন; সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ে শিশুরা, কারণ অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করার মতো আলো তাদের নেই।
নিত্য ব্যবহারের পানির জন্য যেতে হয় অনেক দূরে। পাহাড়ি ছড়াই তাদের একমাত্র ভরসা। শিশুদের কাঁধে, মায়েদের কোমরে জলের পাত্র—এই দৃশ্য সেখানে নিত্যদিনের। পানির জন্য কাটে ঘণ্টা, কাটে পথ; তবু ছড়ার স্রোত শুকিয়ে গেলে জীবন যেন থমকে দাঁড়ায়।
তবু এই জীবনেও আছে একটু আনন্দের দিন—প্রতিটি বৃহস্পতিবার। কেননা এই দিনেই তারা সংগৃহীত ফসল বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়। কাঁধে ফসলের ঝুড়ি, পায়ে পাহাড়ি পথ—বৃহস্পতিবারের সূর্য তাদের কাছে যেন একটুখানি আশার বার্তা বয়ে আনে। বিক্রির টাকায় সংসারের প্রয়োজন মেটে; সেই টাকায় কখনো আসে এক মুঠো লবণ, কখনো একটি খাতা, কখনো বা শিশুর মুখে একটুখানি হাসি।
এমন বাস্তবতার মধ্যে সময়ের স্রোতে বয়ে চলেছে ধোপাছড়ি ত্রিপুরা পল্লী। আলো নেই, পানি নেই, যোগাযোগ নেই—তবু মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম আছে, আছে স্বপ্ন দেখার সাহস। অন্ধকার যত গভীরই হোক, জ্ঞানের আলো, পানির স্রোত আর একটি বৃহস্পতিবারের আশা—এই তিনটিই যেন তাদের জীবনের ক্ষীণ প্রদীপ।
ইউএনও তাঁর পোস্টে লেখেন, "আলো নেই, পানি নেই, যোগাযোগ নেই—তবু মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম আছে, আছে স্বপ্ন দেখার সাহস।"
চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুর রহমান বলেন, "এলাকাটি খুবই দুর্গম, এখানে বিদ্যুৎসহ কোনো নাগরিক সুবিধা নেই। পানির ব্যবস্থাটাও খুবই দুরূহ। ১৯৮৬ সাল থেকে তারা এখানে বসবাস করছে। এই ত্রিপুরা পল্লীর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা যতটুকু সম্ভব সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব।"
ধোপাছড়ি ত্রিপুরা পল্লী পরিদর্শনকালে ইউএনও মো. আবদুর রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকৌশলী আসিফ মোহাম্মদ এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম শাওন ভূঁইয়াসহ অন্যরা।