গুরুত্ব পাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও জনশক্তি রপ্তানি

আজ ভোরে যখন এই পত্রিকা পাঠকের হাতে পৌঁছাবে ততক্ষণে ২১ সদস্যের প্রতিনিধিদল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান পৌঁছে যাওয়ার কথা। এই সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, দেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দেশে জাপানের অর্থায়নে নির্মিত প্রকল্পব্যয় কমানো ও জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।

প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি গত রাত ১২টা ১০ মিনিটে জাপানের উদ্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর  থেকে ছেড়ে আজ (সোমবার) স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা। জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি টোকিওতে হোটেল ইমপেরিয়ালে যাবেন তিনি এবং জাপানে চারদিনের সফরে এ হোটেলেই থাকবেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও ২০০৫ সালে জাপান সফরকালে এ হোটেলে উঠেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। প্রতিনিধি দলে রয়েছেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, মেট্রোরেলসহ চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে আলোচনা, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া, তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা, শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। পরে তার সম্মানে দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নেবেন। ফোরামে তিনি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। তার চিবার এলএনজি টার্মিনাল ও পাওয়ার প্ল্যান্ট, একটি পারমাণবিক সদর দপ্তর এবং নাগোয়ার টয়োটা কারখানা পরিদর্শন করার সূচি রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলছে, যার মধ্য থেকে চার-পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সফর দুই দেশের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে এবং হালনাগাদকৃত ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ (ঋঙওচ) কৌশল বাস্তবায়নে সমন্বয় বাড়াবে।

জাপান বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনি এমদাদ দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি জাপানে জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোরবিষয় নিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হবে।

জাপান বিএনপির প্রচার সম্পাদক শাহাদাত হোসেন রুদ্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে কেন্দ্র করে জাপান বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে জাপান প্রবাসীদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। জাপান দূতাবাস প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল করতে কাজ করছে। আমরা তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করছি। আশা করছি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর সফল হবে। বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু জাপান বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়াবে।’

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বিএনপি চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধামন্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে দুইবার জাপান সফর করেছিলেন। তবে তাদের বড় ছেলে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাপান সফরে যাচ্ছেন।

জিয়াউর রহমানের প্রথম সফর ছিল ১৯৭৮ সালে। ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে তিনি জাপান সফর করেন। ওই সফরে তিনি জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাকেও ফুকোদার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সম্রাট হিরোহিতোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দ্বিতীয় সফর ছিল ১৯৮০ সালে। ১৯৮০ সালের ৮ জুলাই তিনি পুনরায় জাপান সফর করেন। এ দুই সফরের তাৎপর্য ও অর্জন ছিল অসামান্য। এ সফরগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুসংহত হয়। ১৯৮০ সালের সফরে দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাবিষয়ক প্রথম যৌথ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়।

খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে দুবার জাপান সফর করেছিলেন। এর মধ্যে একটি রাষ্ট্রীয় সফর হয় ২০০৫ সালের ১২ থেকে ১৫ জুলাই। তিনি ১৯৯৪ সালেও একবার জাপান সফর করেছিলেন। ২০০৫ সালের সফরে তিনি জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। ওই সফরে ঢাকার আন্ডারগ্র্যাউন্ড মেট্রো রেল ব্যবস্থা চালু, পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে জাইকার সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাপান সরকার ও জাপানের রাষ্ট্রদূত গভীর শোকপ্রকাশ করেছিলেন। খালেদা জিয়ার প্রথম জাপান সফরে তার অন্তত ১২ জন সফরসঙ্গীকে রাজকীয় প্রাসাদে রাখা হয়েছিল। পরেরবার ইমপেরিয়াল হোটেলে উঠেছিলেন খালেদা জিয়া।

১২ জুলাই ২০০৫ খালেদা জিয়ার জাপান সফরে জাপানের টোকিও শহরের তোশিমা সিটির ইকেবুকুরো পশ্চিম উদ্যানে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে দেশের বাইরে এটিই প্রথম শহীদ মিনার। ৩০ হাজার ডলার ব্যয়ে বাংলাদেশ সরকার মিনারটি হামিদুর রহমানের মূল নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করে। লন্ডনে একটি শহীদ মিনার রয়েছে। তবে সেটি প্রবাসীদের অর্থায়নে নির্মিত।

ঢাকাস্থ জাপান দূতাবাসের সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১১ ফেব্রুয়ারি কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়। ওই দিন জাপান বাংলাদেশে দূতাবাস খোলে।