আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও যৌথ অভিযানের মধ্যেই খুলনা মহানগরী ও জেলাজুড়ে গুলি, খুন ও সশস্ত্র হামলার ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন খুলনাবাসী। চলতি অক্টোবর মাসে এ পর্যন্ত ৫টি খুন ও ১০ স্থানে গুলির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩-৪ জন গুরুতর জখম হয়েছেন। মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ, গ্যাং কালচার ও আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে অক্টোবরের বিভিন্ন সময়ে এসব রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
খুলনা নগরীতে সর্বশেষ গত শনিবার ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি পৃথক স্থানে গুলি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এক ব্যবসায়ী ও এক যুবদল নেতা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একটি বেসরকারি ক্লিনিকে গুলি ছোড়ার পাশাপাশি ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
নগরীতে একই দিনে জোড়া খুন ও গুলিবর্ষণের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনটি ছিল ২২ অক্টোবর। মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনা মহানগরীর একই এলাকায় প্রকাশ্যে দুইজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদিন ভোরে সদর থানার পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তুষার (২৭) নামে এক যুবককে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। তার লাশ রাস্তায় পড়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর বিকেলের দিকে লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া বউবাজার এলাকায় মায়ের সামনে খুশি বেগম (২৪) নামের এক গৃহবধূকে গুলি ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা। পুলিশ জানিয়েছে, দুটি ঘটনার সঙ্গেই স্থানীয় অপরাধী চক্র ও মাদকের বিরোধ জড়িত রয়েছে।
এর আগে ৪ অক্টোবর দিঘলিয়া উপজেলায় নাসিমুল করিম নাসিম (৫৫) নামে এক আঞ্চলিক নেতাকে ভ্যানে চড়ে এসে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় রূপসা উপজেলার দুর্জনীমহল গ্রামে আক্তার ঢালীকে (৫০) গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। গত ১৫ আগস্ট ছেলে জয় ঢালীকে হত্যার ৫০ দিন পর বাবাকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। গত ৯ অক্টোবর কয়রা থানার সাবেক ওসি মো. শাহ আলম রাতে ডিউটি থেকে ফেরার সময় নগরীর কলেজিয়েট গার্লস স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। ছিনতাইকারীরা তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ লাইন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত ১৭ অক্টোবর রাত ২টায় নগরীর পশ্চিম টুটপাড়ার আমতলা মোড় এলাকায় শেখ জুম্মান রহমান বিশাল (২৭) নামের এক যুবককে গুলি করে তার মোবাইল ফোন ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত শনিবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) খুলনা সফরে আসেন। এদিন মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি পৃথক স্থানে গুলির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়। আইজিপি আসার দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি হওয়ায় খুলনার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
শনিবার বেলা সোয়া ১১টায় তেরখাদা উপজেলার পারহাজী গ্রামে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা পেছন থেকে রামিম বিশ্বাস (৩২) নামে এক ওয়ার্ড যুবদল সভাপতিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পিঠে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রামীম পারহাজী গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমানের ছেলে। তিনি মধুপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি। তেরখাদা থানার ওসি আহমেদ আলী বিশ্বাস বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া গাছতলা মন্দিরের সামনে আকাশ কুন্ডু (৪৫) নামের এক মুদি দোকানিকে দোকানে বসে থাকা অবস্থায় তলপেটে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায় মোটরসাইকেল আরোহী সন্ত্রাসীরা। খুলনা সদর থানার ওসি লোকমান হোসেন রিপন জানান, কারা এবং কী কারণে গুলি চালিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।
এদিন সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে নগরীর বাবুখান রোডের সন্ধানী ক্লিনিকে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ৮-১০ জনের একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত ক্লিনিকে নিজস্ব ভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে তারা ক্লিনিকের বাইরে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে হেঁটে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় খুলনা মহানগর পুলিশের সদর জোনের সহকারী কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে না। ঘটনার তদন্ত চলছে। জড়িত যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
গতকাল রবিবার নগরীর বসুপাড়া এলাকায় বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াটিয়ার বিরোধের জেরে ভাড়াটিয়াকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে। খুলনায় একের পর এক খুনের ঘটনা ও গুলির শব্দে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার নেতারা এবং স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ উদ্বেগ প্রকাশ করে খুলনাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে বিশেষ অভিযান এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার জানিয়েছেন, দিন যত যাচ্ছে ততই খুলনার অবস্থা খারাপ হচ্ছে। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এখন রাতে বের হতে ভয় পায়। রাত এগারোটা বাজতেই নগরীতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করে।
এ বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কগচ) ও জেলা পুলিশ জানিয়েছে, বেশিরভাগ হত্যাকা-ের নেপথ্যে মাদক এবং অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কোন্দল কাজ করছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক হবে।