দীর্ঘ ৩৪ দিন ধরে চলা সর্বাত্মক শাটডাউন ও ক্লাস বর্জন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে অবশেষে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তবে ক্লাসে ফিরলেও আগের উপাচার্যকে পুনর্বহাল এবং নতুন উপাচার্যকে প্রত্যাহারের এক দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রবিবার সকালে একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে ক্লাসে ফেরার এই সিদ্ধান্তের কথা জানান শিক্ষার্থীরা। এরপর দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায়ও একই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। শিক্ষার্থীদের দেওয়া ওই খোলা চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অচলাবস্থার কারণে তাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে ক্লাসে ফিরতে চান। তবে ক্লাসে ফেরার অর্থ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানো নয়। অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল এবং নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে প্রত্যাহারের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের এই যৌথ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে চিঠিতে।
যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘ দিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষাজীবন মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমরা ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। খুব সম্ভবত আমরা বুধবার বা বৃহস্পতিবার থেকে ক্লাস শুরু করব। তবে আমরা ক্লাসে ফিরলেও এক দফা দাবিতে আন্দোলন চলবে। নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে আন্দোলন কঠোর হবে।
এদিকে দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ সভা করেছে শিক্ষক সমিতি। সভায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন এক যৌথ বিবৃতিতে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরতে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আর প্রলম্বিত করতে চাই না। সভায় তাদের ক্লাসে ফিরে আসার আহ্বান জানানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোন অনুষদে কবে ক্লাস শুরু হবে, তা সংশ্লিষ্ট অনুষদ ও বিভাগগুলো নিজেদের সভায় নির্ধারণ করবে। এ সময় উপাচার্যের ক্যাম্পাসে উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের পরিচালনার বিষয়টি ডিনরা দেখেন। এখানে উপাচার্যের প্রয়োজন হয় না। তবে উপাচার্য যদি ক্যাম্পাসে আসেন, তবে হয়ত আমরা আবার আগের অবস্থায় চলে যাব।
ইউজিসির পরামর্শক কমিটি ক্যাম্পাসে যাচ্ছে বুধবার : বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অচলাবস্থা দূর ও শ্রেণি কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গঠিত ছয় সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরামর্শক কমিটির সদস্যরা আগামী বুধবার ক্যাম্পাস সরেজমিনে পরিদর্শনে যাবেন। এ সময় তারা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
কমিটির আহ্বায়ক ও ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা কাজ শুরু করেছি। ক্যাম্পাসে গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে পৃথকভাবে মতবিনিময় করব। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে আমাদের কমিটিকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা পালন করব।
গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিক অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নতুন উপাচার্য নিয়োগের খবর আসার পর রাতেই শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দিয়ে টানা কর্মবিরতি পালন করছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। টানা আন্দোলনের মুখে ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইন যোগদান করেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তবে আন্দোলন চলতে থাকায় তিনি ১৮ দিন পর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে ৩০ ঘণ্টা নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় তিনি অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
চিকিৎসা শেষে সার্কিট হাউজে ফিরেই অনলাইনে সিন্ডিকেট সভা করেন উপাচার্য। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অচলাবস্থা দূর ও শ্রেণি কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ছয় সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরামর্শক কমিটি গঠন করে।