১ নভেম্বর খুলছে সেন্টমার্টিন

দীর্ঘ অপেক্ষার পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে আবারও পর্যটকদের জন্য খুলছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত দ্বীপটিতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক। তবে এজন্য প্রত্যেক পর্যটককে পরিবেশ সংরক্ষণ বাবদ ১০০ টাকা ফি গুনতে হবে। অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজগুলো চলাচল করবে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে। গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গতকাল রবিবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়; নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়; পরিবেশ অধিদপ্তর; কক্সবাজার জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর সেন্টমার্টিনে নৌযান চলাচলের অনুমতি দিতে পারবে না। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাগুলোও বহাল থাকবে  বলে জানানো হয়েছে।

পর্যটকসংখ্যা বাড়ল ৭৫ শতাংশ : গত পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ও সেখানে রাত যাপনের সুযোগ পেয়েছিলেন। এবার সেই সীমা বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন অনুমোদিত পর্যটকসংখ্যা বাড়ছে দেড় হাজার, যা আগের সীমার তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি।

তবে গত বছরের ১ নভেম্বর দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও সে সময় জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটকেরা দ্বীপটিতে যেতে পারেননি। এ ছাড়া সে সময়ে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিÑ এই দুমাস সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের রাত যাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জানা গেছে, এবারও দ্বীপে রাত যাপনের অনুমতি, অবস্থানের মেয়াদ এবং মাসভিত্তিক বিধিনিষেধের বিষয়ে পর্যটকদের সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

পর্যটন বন্ধে সংকটে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা : এদিকে দীর্ঘদিন দ্বীপের পর্যটন কার্যক্রম সীমিত থাকায় আয় কমেছে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের। পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও নৌযান পরিচালনাকারীদের অনেকেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. জুবাইর বলেন, দীর্ঘদিন দ্বীপের পর্যটনব্যবস্থা প্রায় স্থবির থাকায় জীবন-জীবিকা চরম সংকটে পড়েছিল। জাহাজ চলাচলের সরকারি সিদ্ধান্তে আমরা স্বস্তি ফিরে পেয়েছি। তবে টেকনাফ রুট বন্ধ থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে কিছুটা ভোগান্তি বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা চাই পরিবেশও রক্ষা হোক, আবার স্থানীয় মানুষের জীবিকা নির্বাহের পথও বন্ধ না হয়।

সেন্টমার্টিন হোটেল-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা আমজাদ হোসেন বলেন, ১ নভেম্বর থেকে দ্বীপে পর্যটন চালুর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে দৈনিক সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের সীমা বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক হোটেল ও কটেজ মালিক ব্যাংক ঋণের চাপে রয়েছেন। এমন বিধিনিষেধে ব্যবসা কতটা পুনরুদ্ধার হবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েই যাচ্ছে।

ডিজিটাল নজরদারিতে পর্যটক নিয়ন্ত্রণের তাগিদ : জানা গেছে, পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ নজরদারিতে থাকছে অনলাইন ট্রাভেল পাস, কিউআর কোডযুক্ত টিকিট এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং।  এ বিষয়ে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, দৈনিক সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের সীমা ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। পরিবেশ সংরক্ষণে শুধু পর্যটকের সংখ্যা সীমিত রাখাই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাহাজে বর্জ্য সংগ্রহ, দ্বীপ থেকে বর্জ্য অপসারণ, সৈকত পরিষ্কার রাখা এবং প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি প্রতিরোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাস : পর্যটন চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফজলুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় বাসিন্দাদেরও। পর্যটকেরা যাতে প্লাস্টিক ও অন্যান্য ময়লা সমুদ্রে বা সৈকতে না ফেলেন, তা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক দল ও নজরদারির পরিকল্পনা রয়েছে।

জাহাজ পরিচালনায় প্রস্তুতির দাবি : সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলকারী কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, দীর্ঘদিন পর জাহাজ চলাচল শুরুর সিদ্ধান্ত পর্যটন খাতের জন্য ইতিবাচক। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করে পরিবেশগত নির্দেশনা মেনেই জাহাজ চলাচল করবে বলেও তিনি জানান।