পুরনো ও জরাজীর্ণ যানবাহনে ব্যাহত হচ্ছে পুলিশের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম। অনেক গাড়ির ফিটনেস, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অপরাধ সংঘঠনের আগে বা পরে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে কিংবা জরুরি অভিযানের সময় মাঝপথে থেমে যাচ্ছে গাড়ি। সময় মতো পুলিশ ঘটনাস্থলে যেতে পারলে অনেক অপরাধ সংঘটিত হতো না। যানবাহন সমস্যা একদিকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের অন্তরায়, অন্যদিকে ফসকে যায় অপরাধী। পুলিশের তথ্য বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে প্রায় ৬৪ শতাংশ যানবাহন এখন জরাজীর্ণ। তারপরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে নতুন যানবাহন ক্রয় করতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় প্রস্তাব উপস্থাপনে কথা রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানে পটপরিবর্তনের পর পুলিশের সবকটি ইউনিটে প্রকট আকার ধারণ করে যানবাহন ব্যবস্থাপনা। থানা ও ফাঁড়িগুলোতে যানবাহন নেই বললেই চলে। গাড়ির অভাবে ঠিকমতো অপারেশন কার্যক্রম চালাতে পারছে না পুলিশ। ইতিমধ্যে পুলিশের জন্য অতিরিক্ত যানবাহন চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, দ্রুত যানবাহন ক্রয় করতেই হবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে যানবাহন ক্রয় করা ছাড়া উপায় নেই। অন্তর্বর্তী সময় সরকারের সময় যানবাহন ক্রয় করার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে কেনা হয়নি। অবশেষে সপ্তাহখানেক আগে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার পাঁচ হাজার ৮৩০টি নতুন যানবাহন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তারপরও যানবাহনের ঘাটতি থাকবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। নতুন যানবাহন আসতে তিন বছরের বেশি সময় লেগে যাবে।
পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ৫ আগস্টের আগে ও পরে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং অগ্নিসংযোগের অনেক ঘটনা ঘটেছে। থানা ও ফাঁড়িসহ একাধিক স্থানে হামলা চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র লুটের পাশাপাশি ৪৪ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। এখনো লুট হওয়া সব আগ্নেয়াস্ত্র হয়নি উদ্ধার। হামলা-অগ্নিসংযোগে সহস্রাধিক যানবাহন অকেজো হয়ে পড়ে।
আন্দোলনের সময় বেশি যানবাহনে আগুন : পুলিশের তথ্যানুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকা মহনগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানার ২১টিসহ পুলিশের ২১৬টি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুনে পুড়ে যায় ১৩টি থানা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় পুলিশের বেশ কিছু টহল গাড়িও। বেশি ক্ষতি হয়েছে যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, ভাটারা, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর ও উত্তরা পূর্ব থানা। ঢাকার বাইরে টাঙ্গাইলের গোড়াই হাইওয়ে থানা, বগুড়ার সদর, দুপচাঁচিয়া ও শেরপুর থানা এবং নারুলী পুলিশ ফাঁড়ি, জয়পুরহাট সদর থানা, কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানা, রংপুরের গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ ও গঙ্গাচড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও আশুগঞ্জ থানা, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর থানা, হবিগঞ্জের মাধবপুর ফাঁড়ি, ময়মনসিংহ রেঞ্জ অফিস, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়, দিনাজপুর সদর থানাসহ অসংখ্য স্থাপনায় হামলা ও আগুন দেওয়া হয়। এসব থানায় প্রায় সব ধরনের যানবাহন ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। ওই সময় ৫২৬টি সরকারি গাড়ি আগুন দেওয়ার পাশাপাশি ৫৩৩টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৫৯টি যানবাহন সম্পূর্ণ ভস্মীভূত ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহনেও কাবু হয়ে পড়েছে পুলিশ। অনেক যানবাহনের নেই ফিটনেস।
৫৮৩০টি গাড়ি কেনার উদ্যোগ : পুলিশ সূত্র জানায়, পুুলিশের পরিবহন ব্যবস্থা সমৃদ্ধ করতে দুটি প্রকল্পে ৫ হাজার ৮৩০টি গাড়ি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি অর্থায়নে দুই প্রকল্পে ৬৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব গাড়ি কেনা হবে। এর মধ্যে ‘পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পে ৪৩২৮ কোটি ৯২ লাখ ৪৭ হাজার টাকায় সাধারণ কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী ৪৮২৯টি গাড়ি কেনা হবে এবং অন্য প্রকল্পে ১০০১টি বিশেষায়িত গাড়ি কেনা হবে। গতকাল রবিবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের কারণে সভাটি স্থগিত করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পুলিশ। দুটি প্রকল্পই ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা। এ ছাড়া গাড়ি মেরামতের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ৬৫০ জন হালকা যানবাহন চালক ও ৩০০ জন ভারী যানবাহনচালককে গাড়ি চালানো ও যান্ত্রিক বিষয়ে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া আরও ৫০ জনকে আলাদাভাবে মেকানিকের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
প্রস্তাবে যা বলা হয়েছে : প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে জেলা ও মহানগর পুলিশের অধীন ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানা রয়েছে। এ ছাড়া ২৪টি রেলওয়ে থানা ও ৭৩টি হাইওয়ে থানা সংশ্লিষ্ট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে। একটি থানার অধীনে সাধারণত বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকা রয়েছে। তাই একই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় টহল পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে ৬৩৯টি থানায় মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি যানবাহন রয়েছে। এসব যানবাহন দিয়ে টহলসহ পুলিশের অন্য কার্যক্রম পরিচালনা অত্যন্ত দুষ্কর। এ ছাড়া এসব যানবাহনের ৬৪ শতাংশের বয়স ১০ বছরের বেশি হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে যানবাহনের স্বল্পতা ও পুরনো গাড়ির কারণে পুলিশের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত টহল গাড়ি থাকলে জনশৃঙ্খলা রক্ষা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং অপরাধ সংঘঠনের পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও আলামত সংরক্ষণ সহজ হয়। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন ও বড় ধরনের আয়োজনের সময় দেশের বিভিন্ন থানায় একযোগে অতিরিক্ত গাড়ির প্রয়োজন হয়। এ পরিস্থিতিতে পুলিশের যানবাহন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন গাড়ি কেনার প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
দেওয়া হবে বিশেষ প্রশিক্ষণ : ‘পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২২৮০ কোটি ১৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের ৯১০ জন কর্মীকে গাড়ি চালানো ও যান্ত্রিক বিষয়ে এবং ৫০ জনকে মেকানিকের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটির প্রধান উদ্দেশ্য সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ তদন্ত এবং দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো। এই বিষয়ে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের গাড়ি জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে। মোবাইল কমান্ড সেন্টার অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণকক্ষ হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে অভিযান পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করা যাবে। অপরাধস্থল থেকে দ্রুত আলামত সংগ্রহ ও তদন্তে সহায়তার জন্য থাকবে বিশেষায়িত গাড়ি।
তোড়জোড় করেও ক্রয় করেনি অন্তর্বর্তী সরকার : পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশি কার্যক্রমের গতি বাড়াতে তোড়জোড় শুরু করে। বিশেষ করে যানবাহন ক্রয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর দফায় দফায় বৈঠক করে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যানবাহনের সংকট কাটাতে পুলিশের জন্য জিপ, ডাবল ও সিঙ্গেল কেবিন পিকআপসহ ৪৩১টি যান কেনা হবে। এর জন্য বাজেট ধরা হয় ২৭৫ কোটি টাকা। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তবে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশের যানবাহন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত হয়। সরকারও চাচ্ছে পুলিশকে আধুনিক ও জনবান্ধব গড়ে তুলতে।
অনেক গাড়ি চলছে ২০ বছরের অধিক : একাধিক থানার ওসি দেশ রূপান্তরকে বলেন, থানায় আগে যে গাড়ি ছিল, এখন তার অর্ধেকের কম রয়েছে। নতুন করে তিনটি গাড়ি পেলেও তা দৈনন্দিন কাজের জন্য যথেষ্ট নয়। নির্বাচনের সময় যখন জনবল ও মুভমেন্ট দ্বিগুণ হবে, তখন সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কবে নতুন যানবাহন আসবে তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো উপায় না দেখে ভাড়ায় লেগুনা বা অন্য যানবাহন নিতে হচ্ছে। পুলিশের পরিবহন নীতিমালায় বলা আছে, পুলিশের একটি গাড়ি আট বছরের বেশি চালানোর নিয়ম নেই। কিন্তু অনেক গাড়িই ২০ বছরের বেশি রাস্তায় চলাচল করছে। অনেক সময় মাঝ রাস্তায় গাড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনগুলো দিয়েই পুলিশ কাজ চালাচ্ছে। গাড়ি নষ্ট হলে পুলিশের কারখানায় দিলেও সঠিকভাবে মেরামত করা যাচ্ছে না। তারা আরও বলেন, পুলিশের কাজ শুধু অপরাধী শনাক্ত করা কিংবা মামলা তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, টহল দেওয়া, আসামি গ্রেপ্তার, আলামত সংগ্রহ, ভুক্তভোগীকে উদ্ধার, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনাস্থলে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে যানবাহন। কিন্তু পুরনো, জরাজীর্ণ কিংবা নিয়মিত চলাচলের অনুপযোগী যানবাহনের কারণে অসহায় হয়ে পড়ছি আমরা।
যন্ত্রণা বেশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি : পুলিশের বেশির ভাগ গাড়ির নেই ফিটনেস। একটি গাড়ি বিশ বছরের বেশি পুরনো হলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে সমস্যা হচ্ছে। পুলিশের গাড়ি চালকরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, থানার বেশিরভাগ গাড়িই অনেক পুরনো। মাঝেমধ্যেই পথে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। তখন সবাই মিলে ধাক্কা দিয়ে চালু করতে হয়। এইভাবে প্রতিদিন মহাসড়কে টহল দিতে ঝুঁকি নিয়েই গাড়ি বের করতে হয়। ফিটনেসবিহীন গাড়িতে চড়েই ডিউটিতে যেতে হয় নিয়মিত। পুলিশের গাড়ি সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল চলছে রাস্তায়। এসব গাড়ির বেশির ভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসহীন। বেশিরভাগ পিকআপ ভ্যান, জিপ, প্যাট্রল জিপ, মাইক্রোবাসের কোনোটির হেডলাইট জ্বলে না, কোনোটির সামনের অংশ চ্যাপ্টা হয়ে গেছে, কোনোটি রংচটা, কোনোটির ব্রেক নেই। ডিএমপির পরিদর্শক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের বেশির ভাগ গাড়িই ফিটনেসবিহীন। অনেক গাড়ি চলন্ত অবস্থায় স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। পরে রাস্তা থেকে রেকার দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে হয়। গ্রামগঞ্জে গাড়ির অভাবে আসামি ধরতে যায় না পুলিশ। রাতে টহল দিতে গেলে হঠাৎ গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। তখন টর্চলাইট জ্বালিয়ে পথ চলতে হয়। বর্ষার দিনে সামান্য বৃষ্টি হলেই গাড়ি স্টার্ট নেয় না।