৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত প্রকল্পে বিশেষ সুবিধা

দেশে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত বিস্তরণ ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সর্বোচ্চ ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও অনুমোদনের জন্য অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। এ ব্যবস্থায় অপারেশনাল এক্সপেনডিচার বা ওপেক্স মডেলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্দিষ্ট ক্রয় প্রক্রিয়ায় ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) বাধ্যতামূলক না রাখাসহ বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। সম্প্রতি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ‘আগামী গ্রীষ্মের আগেই ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সরকারের আশা, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও সহজ বিনিয়োগ কাঠামো থাকলে ছোট ছোট বিনিয়োগ বাড়বে। এর মাধ্যমে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।’

গত ১৯ অক্টোবর ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে।

নতুন অধ্যাদেশে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, চা-বাগান, সেচপাম্প, কোল্ড স্টোরেজ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে বৃহৎ ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এ অধ্যাদেশের আওতাভুক্ত হবে না। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে বিনিয়োগ, সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, বিদ্যুৎ বিল সমন্বয়, সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

ওপেক্স মডেলে অগ্রাধিকার : অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে ওপেক্স মডেলকে। এ ব্যবস্থায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিনিয়োগে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। উৎপাদিত বিদ্যুতের অংশ বা মূল্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে। এতে গ্রাহকের নিজস্ব বিনিয়োগের প্রয়োজন কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

অন্যদিকে নিজস্ব তহবিল বা নিয়মিত আয় রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠান চাইলে ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার বা ক্যাপেক্স মডেলে নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবে। এক্ষেত্রে প্রকল্পের মালিকানা থাকবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্র্তৃপক্ষ জেলাভিত্তিক নির্দিষ্টসংখ্যক যোগ্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করবে। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গ্রাহক সেবাপ্রদানকারী নির্বাচন করবেন। তবে গ্রাহক চাইলে তালিকার বাইরের প্রতিষ্ঠানকে দিয়েও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবেন।

ক্রয়ে বিশেষ সুবিধা : সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে গ্রাহক, সেবাপ্রদানকারী ও উপযুক্ত কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিধান রাখা হয়েছে। চুক্তিতে যন্ত্রপাতির গুণগত মান, নিরাপত্তা, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুতের বণ্টন, গ্রাহকের প্রাপ্য বিদ্যুতের অংশ, মূল্য নির্ধারণ এবং বিল পরিশোধের শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রপাতি ও ই-বর্জ্যরে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারের অনুপযোগী যন্ত্রাংশ ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও চুক্তিতে রাখতে হবে।

সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ক্যাপেক্স মডেলে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা কেনার আর্থিক সীমা অনূর্ধ্ব ৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশে সংশ্লিষ্ট ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে না। এ ছাড়া চুক্তির অনুমোদন ও মেয়াদ নির্ধারণে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।

নিট-মিটারিংয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের মূল্য : অধ্যাদেশে নেট-মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজস্ব চাহিদা পূরণে ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রাখা হয়েছে। গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ নির্ধারিত বিলিং মেয়াদে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। সমন্বয়ের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকলে প্রযোজ্য বিধান ও সরকার নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী তার মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এ ছাড়া নিট-মিটারিং সম্প্রসারণে প্রণোদনামূলক কার্যক্রম গ্রহণের বিধান রয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রমের নীতিগত দিকনির্দেশনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় পলিসি কাউন্সিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এবং বিভিন্ন বিভাগের সচিব ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন। কাউন্সিল নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়, নিট-মিটারিং, প্রণোদনা ও বিনিয়োগ মডেল বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।

চুরি ও ক্ষতিসাধনে কারাদণ্ড : সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ চুরি, চোরাই যন্ত্রাংশ কেনাবেচা, স্থাপনার ক্ষতিসাধন, অবৈধ সংযোগ এবং স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বাধা দেওয়ার জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে।

যন্ত্রাংশ চুরি বা চোরাই যন্ত্রাংশ কেনাবেচার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনার ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। অবৈধ সংযোগ এবং স্থাপন কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

সরকার আশা করছে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে বিনিয়োগ ও সেবাপ্রদানের কাঠামো নির্দিষ্ট করার ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গতি আসবে।