সিরাজগঞ্জের বেলকুচি অটিজম স্কুলটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় থমকে গেছে শতাধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর মানসিক বিকাশ। এতে ব্যাহত হচ্ছে তাদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক আচরণ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, কর্মহীন হয়ে পড়েছেন স্কুলটির ২০ জন শিক্ষক-কর্মচারী। প্রশাসনিক জটিলতায় স্কুলটি পুনরায় চালু না হওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে শিশুদের ভবিষ্যৎ।
সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, অবহেলিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে বেলকুচি সদর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্কুলটির যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন পৌর মেয়র ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় শিক্ষা কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গেই চলছিল। শুরু থেকেই স্কুলটি নিয়ে ব্যাপক সাড়া পান শিক্ষকরা। সর্বশেষ শিক্ষার্থী ছিল ১০৮ জন। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অজ্ঞাত কারণে হুট করেই বিদ্যালয়টির সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। নতুন করে স্কুলটি আবার চালু করতে চাইলেও প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় বর্তমানে স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যালয়টির ছাত্রী সুমাইয়ার বাবা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বেলকুচিতে একটি মাত্র অটিজম স্কুল। আমার মেয়ে এই স্কুলে পড়াশোনা করে অনেকটাই স্বাভাবিক মানুষের মতো আচার-আচরণ করত। স্কুলে আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়ে মানসিকভাবে সবসময় সতেজ থাকত। দীর্ঘদিন স্কুলটি বন্ধ থাকায় সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। বেলকুচিতে অনেক অটিজম শিশু আছে। তাদের কথা বিবেচনা করে স্কুলটি আবার চালু করার জন্য প্রশাসনের কাছে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।’
স্কুলের শিক্ষক তানজিদ বলেন, ‘বেলকুচি সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভবনে আমাদের স্কুলটি চলত। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরে অজ্ঞাত কারণে আমাদের অটিজম স্কুলটি ইউনিয়ন পরিষদের ভবনে কার্যক্রম বন্ধ করতে বলা হয়। পরবর্তী সময়ে পুনরায় স্কুলটি চালু করলেও বেলকুচি পৌরসভা ও উপজেলা সমাজসেবা অফিস থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা না পাওয়ায় স্কুলটি বন্ধ রয়েছে।’
বেলকুচি অটিজম স্কুলের প্রধান শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নানামুখী প্রশাসনিক ও আর্থিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়েই আমরা পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পট পরিবর্তনের পর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ঘর খালি করার নির্দেশ দিলে আমরা শিক্ষা উপকরণ সরিয়ে নিতে বাধ্য হই। বর্তমানে স্কুলের সব কার্যক্রম বন্ধ। আমাদের শিক্ষকরাও দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন অবস্থায় অলস ও কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।’
বেলকুচি সদর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ভুট্টো সরকার বলেন, ‘অটিজম স্কুলটি কিছুদিন চালানোর জন্য নেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের পর বেশ কিছু দিন বন্ধ থাকার পর স্কুলটা আবার তারা চালু করতে চায়। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে স্কুল চালানোর জন্য কোনো অনুমতি না থাকায় স্কুলটিকে বন্ধ করতে বলি।’
জানা গেছে, বেলকুচিতে প্রকৃতিকসহ নানা কারণে অটিজম ও জন্মগত স্নায়ুবিক জটিলতা নিয়ে শিশু জন্ম নেওয়ার হার বেড়ে গেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে। অটিজম শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা না করলে তারা সমাজের বোঝা ও পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তাই একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে তাদের সুযোগ ও শিক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বেলকুচি পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। আমরা সরেজমিনে তদন্ত পরিচালনা করে স্থানীয় সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খানের ডিও লেটারসহ প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাই। এখন স্কুলটি পুনরায় চালু করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় থেকেই আসবে। মন্ত্রালয় থেকে স্কুলটির অনুমোদন না আসা পর্যন্ত কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারছি না।’