হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ 

‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ, বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না।’ গানের এই কথাগুলো মনে করিয়ে দেয় গ্রামবাংলার এক হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের কথা। একসময় মেলা, হাট কিংবা গ্রামের পথে ঘাটে রংবেরংয়ের পোশাক পরা বায়োস্কোপওয়ালাদের দেখা মিলত। কাঁধে কাঠের বাক্স নিয়ে চষে বেড়াতেন গ্রামের পর গ্রাম। সঙ্গে থাকত ঝুনঝুনি কিংবা ডুগডুগি। গান আর ছন্দের তালে মানুষকে কাছে টেনে আনতেন তারা।

ছোট কাঠের বাক্সের গায়ে থাকত কয়েকটি গোলাকার লেন্স। দর্শনার্থীরা লেন্সে চোখ রেখে দেখতেন একের পর এক ছবি। আর হাতল ঘুরিয়ে বায়োস্কোপওয়ালা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে ছন্দে ছন্দে বলে যেতেন গল্প। ছোট্ট বাক্সের ভেতর দিয়েই খুলে যেত এক বিস্ময়কর পৃথিবী।

বায়োস্কোপে দেখানো হতো ক্ষুদিরামের ফাঁসি, বেদের মেয়ে জোসনা, মক্কা-মদিনা, আগ্রার তাজমহল, কারবালা প্রান্তরের যুদ্ধ কিংবা ঐতিহাসিক নানা ঘটনার চিত্র। দেখার জন্য দিতে হতো চার আনা, দশ পয়সা। পয়সার বদলে চাল, শাকসবজিও নিতেন অনেকে। শিশু-কিশোর থেকে গৃহবধূ, সবাই ছিলেন এর দর্শক।

বাংলায় বায়োস্কোপের ইতিহাসও বেশ পুরনো। ১৮৯৬ সালে স্টিফেন্স নামের এক বিদেশি একটি থিয়েটার দলের সঙ্গে কলকাতায় এসে প্রথম বায়োস্কোপ দেখান।

তার অনুপ্রেরণায় দুই বছর পর ১৮৯৮ সালে মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিকভাবে বায়োস্কোপ দেখানো শুরু করেন। এরপর থেকেই বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে বায়োস্কোপে ছবি প্রদর্শন ও চলচ্চিত্রচর্চা।

তবে সেই সোনালি সময় এখন অতীত। ঘরে ঘরে টেলিভিশন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, কম্পিউটার আর এখন স্মার্টফোন-ইন্টারনেটে বদলে গেছে বিনোদনের ধরন। কমেছে বায়োস্কোপের দর্শক, হারিয়েছে অনেক বায়োস্কোপওয়ালার জীবিকা।
এখন গ্রামগঞ্জের মেলা বা হাটবাজারে আগের মতো বায়োস্কোপের দেখা মেলে না। কোথাও কোথাও লোকজ ও কারুশিল্প মেলায় কালেভদ্রে দেখা মেলে।

শুধু একটি কাঠের বাক্স নয়, বায়োস্কোপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একসময়ের মানুষের আনন্দ, আবেগ, লোকসংস্কৃতি ও জীবিকার গল্প। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে প্রয়োজন সংরক্ষণ, প্রদর্শনী এবং লোকজ উৎসবে এর নিয়মিত আয়োজন।