‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্য: বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নিন্দা

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্যের তীব্র নিন্দা, গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক দল। একই সাথে তারা এই বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং তার অপসারণের দাবি জানিয়েছে।  

সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মন্তব্য করেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করব’। তার এই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত। জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী, জীবন রক্ষায় একান্ত অনিবার্য হলেই কেবল ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, অপরাধ দমনের নামে বিচারপ্রক্রিয়া এড়িয়ে কাউকে হত্যা করার অনুমতি সরকারেরও নেই।

টিআইবি আইজিপির এই বক্তব্যকে ‘অপরিণামদর্শী’ ও বিপজ্জনক বার্তা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। টিআইবির বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারের কোনো অনুমোদনই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না। সংস্থাটি আইজিপির অপসারণ, বক্তব্য প্রত্যাহার এবং নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছে।

আইজিপির এমন বক্তব্যের পর এক বিবৃতিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলেছে, কোনো নাগরিক অপরাধে অভিযুক্ত হলেও তাকে আদালতের বাইরে গিয়ে হত্যার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। এই বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারত্ব ও সাংবিধানিক দায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা সরকারের কাছে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে।

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এক বিবৃতিতে বলেছে, পুলিশপ্রধানের এ বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বিচারবহির্ভূত হত্যার ছাড়পত্র হিসেবে দেখা হতে পারে। সংগঠনটির দাবি, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঁচটি বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা তারা নথিবদ্ধ করেছে। ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার চেয়েছে অধিকার।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বিবৃতিতে বলেছে, অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের বৈধতা নির্ভর করে আইনের প্রতি আনুগত্যের ওপর, বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির ওপর নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অপরাধীর বিচার আদালতেই হতে হবে—রাষ্ট্রীয় অনুমোদনেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো সুযোগ থাকতে পারে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আইজিপির বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব বাংলাদেশ পুলিশের। পুলিশ নাগরিকদের সেবক, শাসক নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান ব্যক্তি হয়ে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আইজিপি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তিনি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন।

আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটি বলেছে, সরকার পুলিশের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষমতা তুলে দিতে পারে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলিবর্ষণের স্মৃতি উল্লেখ করে এবি পার্টি বলেছে, ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার বার্তা জনমনে নতুন আশঙ্কা তৈরি করছে।

আইজিপির এই বক্তব্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশের ভূমিকার স্মৃতি ফিরে আসে বলে উল্লেখ করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।