স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৮ মার্চ প্রথমবার কক্সবাজার সফরে এসে সালাহউদ্দিন আহমদ জেলায় কর্মরত সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সে সময় তিনি আধুনিক ফায়ার স্টেশনের জমিটি দখলমুক্ত করার নির্দেশনা দেন। কিন্তু এরপর সাড়ে ৭ মাস কেটে গেলেও প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার ৬৩ শতক জমি দখলদার মুক্ত হয়নি
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, প্রথম মতবিনিময় সভাতেই ফায়ার সার্ভিসের জমিতে অবৈধ দখলদার থাকার বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নজরে আনা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি জেলা প্রশাসনকে জমিটি দ্রুত দখলমুক্ত করতে নির্দেশনাও দেন। কিন্তু এখনো দখলদারদের কবলেই রয়েছে প্রায় ৬৩ শতক জমি।
জেলা প্রশাসন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শহরের জাম্বুর মোড় এলাকার ডিসি বাংলোর নিচে আধুনিক ফায়ার স্টেশন নির্মাণের জন্য ২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর ফায়ার সার্ভিস ৮০ শতক জমি কেনে।
কিন্তু ৫ সরকারি কর্মচারীর পরিবারের অবৈধ দখলের কারণে সে সময় মাত্র ১৭ শতক জমি বুঝে পায় সংস্থাটি। অবশিষ্ট ৬৩ শতক জমিতে একচ্ছত্র ‘জমিদারি’ চালাচ্ছে ওই ৫ পরিবার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত দখলদারদের মধ্যে রয়েছেন জেলা প্রশাসনের কর্মচারী ও হিল ডাউন সার্কিট হাউজের পাম্প অপারেটর আবদুর রশিদ, ডিসি অফিসের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আবদুল হাকিম, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রভাবশালী কর্মচারী সিরাজ মিয়া ও সাবেক কর্মচারী মৃত গোলাম কাদের মিস্ত্রির তিন ছেলে ও এক মেয়ে এবং পর্যটন করপোরেশনের সাবেক কর্মচারী, বর্তমানে কলাতলীর বৈশাখী রেস্তোরাঁয় কর্মরত নারায়ণ দে। সেখানে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করার পাশাপাশি ঘর ভাড়াও দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সরকারি জমি পরিমাপ কিংবা সীমানা চিহ্নিত করতে গেলেই ৫ পরিবারের বাঁধার মুখে প্রশাসন বারবার ফিরে আসে। নামপ্রকাশ না করার শর্তে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এক কর্মচারী বলেন, সীমানা নির্ধারণ কিংবা দেয়াল নির্মাণ অনেক দূরের বিষয়। ওইদিকের ছবি তুলতে গেলেও দখলদাররা ঝগড়া শুরু করে। কিন্তু আমাদের এখানে থাকতে হয়, তাই আমরা কিছু বলতে পারি না।
এই অবৈধ দখলের কারণে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে হাতে নেওয়া কক্সবাজারের আধুনিক ফায়ার স্টেশন প্রকল্পটি পুরোপুরি আটকে গেছে। এই নতুন স্টেশনের জন্য ডুবুরি দল, অ্যাম্বুলেন্স টিমসহ ৬৫ জনের একটি নতুন দল বরাদ্দ রয়েছে। এ ছাড়া বহুতল ভবনের আগুন নির্বাপণ ও উদ্ধার কাজের জন্য টিটিএল ও স্নোকেল গাড়ি এবং বীমা নামের আরেকটি উন্নত মানের গাড়ি বরাদ্দ থাকলেও জায়গা না থাকায় মূল্যবান গাড়িগুলো বর্তমানে চট্টগ্রামে ফেলে রাখা হয়েছে। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য বলেন, কক্সবাজারের জন্য দুটি স্টেশন বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে একটি আধুনিক ফায়ার স্টেশন ও অন্যটি প্রথম শ্রেণির। তবে জমির দখল না পাওয়ায় আধুনিক ফায়ার স্টেশন নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে অবৈধ দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত আবদুর রশিদ, আবদুল হাকিম, মৃত গোলাম কাদের মিস্ত্রির ছেলে আইনজীবী আবদুর রউফ ও নারায়ণ দে বলেন, ফায়ার সার্ভিস ২০২০ সালে ডিসি বাংলোর এখানে এসেছে। কিন্তু ১৯৮০ সাল থেকে এই এলাকায় বসতি রয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে এখানে উচ্চ আদালতের উচ্ছেদ না করার স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মুশিবুর রহমান বলেন, ফায়ার সার্ভিস জমি কিনেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৬ নং খতিয়ান থেকে। ভূমি অফিস ও গণপূর্ত যৌথভাবে ইতিমধ্যে ওই জমির সীমানা নির্ধারণ সম্পন্ন করেছে। এই জমিটি জেলা প্রশাসনের নয়, কাজেই ওখানে যারা বসবাস করছেন তারা সবাই সম্পূর্ণ অবৈধ দখলদার।
উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সহকারী কমিশনার বলেন, ওই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আমার জানা নেই। সাইনবোর্ডের যে খতিয়ান ও দাগ নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে, তার সঙ্গে ফায়ার স্টেশনের জমি কিংবা আশপাশের জমির কোনো সম্পর্ক নাই।
এ বিষয়ে কক্সবাজার আদালতের আইনজীবী ইউসুফ আরমান বলেন, হাইকোর্ট যে খতিয়ান ও দাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সেটা সেখানেই কার্যকর হবে। অন্যত্র করা মানে হাইকোর্টের সঙ্গে প্রতারণা। শহরবাসীর প্র্রাণের দাবি আধুনিক ফায়ার স্টেশন। এটি করতে যারা আদালতকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদেশ নিয়েছেন তারা জনগণের শত্রু।
কক্সবাজার গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৬ নং খতিয়ান থেকে ফায়ার সার্ভিসকে জমি বিক্রি করা হয়। তবে অবৈধ দখলদারদের বাধার কারণে মাত্র ১৭ শতক জমি বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহেই অবৈধ দখলদারদের তালিকা জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, আধুনিক ফায়ার স্টেশনের জমির দখলদারদের তালিকা করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। তালিকা পেলেই দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজার সদর উপজেলায় প্রায় ৮ লাখ লোকের বসবাস। এখানে হাজারের অধিক উঁচু দালান এবং ৫ শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিনিয়ত পাহাড় ধস, অগ্নিকা-, সমুদ্র গোসলে গিয়ে মৃত্যু এবং ট্রলার ডুবির মতো বহুমাত্রিক দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজ চালাতে একটি মাত্র প্রথম শ্রেণির স্টেশন পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়া কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম, রেল লাইন, সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা থাকায় তাদের দাবি, প্রথম শ্রেণির স্টেশনের পাশাপাশি একটি আধুনিক ফায়ার স্টেশন নির্মাণ।