বেড়েছে মব সহিংসতা

সাতক্ষীরার দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের হোটেলকর্মী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের (৩৮) বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ১২ অক্টোবর স্থানীয় বাজারে তাকে মারধর করা হয়। পরে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে স্বজনরা তাকে পল্লীচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যান। পরের দিন ফেসবুক লাইভে শামীমের শাস্তি দাবি করে সবাইকে ওই চেম্বারের সামনে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান পাশের পারুলিয়া গ্রামের ফজলুল হক আমিনী। একপর্যায়ে কয়েকশ মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করেন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। রাতে ফজলুল হকের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে আবারও শামীমকে মারধর করা হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। হত্যার পরও ক্ষান্ত হয়নি বিক্ষুব্ধ জনতা; শামীমের বুকের ওপর ওঠে বহু মানুষকে উল্লাস করতে দেখা যায় একটি ভিডিওতে। তার জানাজা ও দাফনেও বাধা দেওয়া হয়।

এ ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে দিন কাটছে শামীমের পরিবারের। বাড়িতে থাকতেও ভয় পাচ্ছেন তার স্ত্রী নাজমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘শামীম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। নিয়মিত ওষুধ খেতে হতো। তার আয়ে সংসার চলত। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে চলব; বুঝতে পারছি না। বাড়িতে থাকতেও ভয় লাগে। ও অন্যায় করলে বিচার হতো, কিন্তু এভাবে মেরে ফেলল!’

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একের পর এক মব সহিংসতার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যখন-তখন মব সহিংসতা হলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর হার কমে এসেছিল। এ ধরনের সহিংসতা ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে গত কয়েক দিনে ফের মব সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত অর্থাৎ ১৫ দিনে মব সহিংসতায় ও গণপিটুনির আটটি ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০ জন নিহতসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেছেন মব সহিংসতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ অনুসরণ করছে। অপরাধের বিচার করার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সহিংসতা বা গণপিটুনির ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন সন্দেহভাজন এলাকায় নিয়মিত তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর যশোর সদর উপজেলার চান্দুটিয়া গ্রামে করিমন চুরির অভিযোগে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে মিজানুর রহমান নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। এই ঘটনায় খালে লাফিয়ে নিখোঁজ হন বিল্লাল হোসেন নামে আরেক জন। ডুবুরি দিয়ে তল্লাশি চালিয়েও খালে তার সন্ধান মিলেনি বলে গতকাল জানিয়েছেন যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ১২ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের হোটেলকর্মী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) কয়েক দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৪ তারিখে নোয়াখালীর সোনাপুরে হাসিব ওয়ার্কশপ থেকে ব্যাগ চুরির অভিযোগে প্রতিবন্ধী যুবক কবির হোসেনকে (২৫) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৮ অক্টোবর ভোলার সদর উপজেলার রাজাপুরে বিএনপি নেতা হোসেন মাঝিকে ছুরিকাঘাতে আহত করার ঘটনায় আসিফ (২৩) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২২ তারিখ রাতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শিশু চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মো. আলম শেখকে (৪১)। গত রবিবার রংপুর গঙ্গাচড়া উপজেলায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে এজারুল হক (৪৬) ও সাদিকুল ইসলাম (২৫) নামে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন রাতে কক্সবাজার উখিয়ার ময়নারঘোনা রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৮ তে চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে আল আমিন (৩০) নামে এক রোহিঙ্গা নিহত, নারীসহ তিনজন আহত হয়েছেন। সবশেষ গতকাল সোমবার রংপুর মিঠাপুকুরে চোর সন্দেহে জোড়গাছ দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা মো. মাহবুব হোসেনের ছেলে মো. খালিদ হাসানকে (২৫) পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে সকালে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁওয়ে রিকশা গ্যারেজে চুরির অভিযোগে মো. হাসান (৩০) নামের আরেক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। 

সাম্প্রতিক সময়ে এরকম মব সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলছে। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই কাউকে ধরে মারধর, এমনকি পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করে  নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হচ্ছে। সেই হামলায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি কেউ কেউ মুঠোফোনে ধারণ করছেন নির্যাতনের দৃশ্য, পরে তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন ফেসবুকে। যেন কাউকে বিনা বিচারে শাস্তি দেওয়ার মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের কৃতিত্ব, আর সেই কৃতিত্বের জানান দিতেই এই আয়োজন। অথচ অভিযোগের সত্যতা যাচাই, অপরাধ নির্ধারণ কিংবা শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি বা উত্তেজিত জনতার নয়; তা আদালতের। কিন্তু সেই আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা থামছে না। বরং সহিংসতার ঘোষণা, সংঘবদ্ধ হামলা এবং নির্যাতনের ভিডিও প্রচারের মধ্য দিয়ে মব বেড়েই চলেছে।

অপরাধ ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগের তদন্ত ও বিচার আদালতের বিষয়। অপরাধ প্রমাণের আগেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অপরাধের শামিল। বিচারব্যবস্থা ও পুলিশের ওপর আস্থার ঘাটতি থেকে মানুষের মধ্যে এমন প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।

আইনের শাসনের প্রতি আস্থা রাখতে হবে : পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. সায়েদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেউ অপরাধ করলে আইন আছে, আদালত আছে। সেগুলো উপেক্ষা করে আইন হাতে তুলে নেওয়া কারও জন্যই ভালো হবে না। যেখানেই অপরাধ হচ্ছে, সেখানেই পুলিশ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। পুলিশের অনেক ধাপ রয়েছে। কোনো অপরাধ হলে পুলিশকে জানাতে হবে। তা না করে আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। আবেগের লাগাম টানতে হবে। ‘নগদ’ বিচার বলে কিছু নেই, ধৈর্য ধরতে হবে। আইনকে আইনের গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। আইনের প্রতি সম্মান ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়াতে হবে : মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থার সংকট থেকেই বিক্ষুব্ধ জনতার এমন প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনগত প্রতিকার না পাওয়ায় কেউ কেউ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয়। শুধু আইন প্রয়োগ করে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থা ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের নিয়ে সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কমিউনিটির সহায়তা ছাড়া পুলিশ এককভাবে মব প্রতিরোধ করতে পারবে না। অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে আইন হাতে তুলে নেওয়া আরেকটা অপরাধ। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। 

বহু মানুষের সম্পৃক্ততায় তদন্তে জটিলতা : মাঠ পর্যায়ে কাজ করা পুলিশ সদস্যরা বলছেন, মবের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সম্পৃক্ততা থাকায় আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে জটিলতা তৈরি হয়। ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পর তাদের অবস্থান খুঁজে বের করতেও বেগ পেতে হয়। আবার আসামি গ্রেপ্তারে গেলে তার পক্ষের লোকজন বাধা দেন। কেউ কেউ আসামির কর্মকা-কে সমর্থন করে জনমত তৈরির চেষ্টা করেন, এমনকি পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করেন।

সাতক্ষীরার দেবহাটায় মব করে হোটেলকর্মী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে হত্যার ঘটনায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দেবহাটা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল আমিন বলেন, ‘আসামির সংখ্যা অনেক হওয়ায় ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করতে হচ্ছে, যা বেশ জটিল। ঘটনার সময় প্রায় আড়াইশ মানুষ একত্র হয়ে হামলা চালালেও তারা সবাই একই এলাকার বাসিন্দা নন। শামীমকে মারধরের সময় অনেক পথচারী ও উপস্থিত লোকজনও এতে জড়িয়ে পড়েন। পরে তারা যে যার মতো নিজ নিজ এলাকায় চলে গেছেন।’

একই ধরনের জটিলতার কথা জানান রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আজিজুর রহমান। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মব করে আলম শেখকে হত্যার ঘটনায় তিনি বলেন, এ ঘটনায় একজনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। সেই আসামি মোস্তাফিজুর রহমান অয়নকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিরা অজ্ঞাতনামা হওয়ায় তাদের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই আইনের আওতায় আনতে হবে। আজিজুর রহমান বলেন, মবের ঘটনায় মূল সমস্যা হলো আসামি শনাক্ত করা। অনেক মানুষ মিলে ঘটনা ঘটালেও তাদের সবার ঠিকানা এক নয়।

ফৌজদারি আইনবিদ ও আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেউ যত বড় অপরাধই করুক, তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। অপরাধ প্রমাণের আগে আইন হাতে তুলে নেওয়া, কাউকে মারধর ও হত্যা করাও অপরাধ। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনোভাবেই এ ধরনের কর্মকা-কে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব রয়েছে। আইন নিজের হাতে না তুলে আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।