এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল

এবার সব বোর্ডেই নতুন প্রযুক্তি

পাবলিক পরীক্ষার (এসএসসি ও এইচএসসি) ফলাফল তৈরিতে ৩২ বছর আগের প্রযুক্তি থেকে সরে আসছে সরকার। তবে পুরোপুরি বাতিল নয়, পুরনো পদ্ধতির পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তিতে ফলাফল তৈরি করা হচ্ছে। গত দুই বছর ধরে ঢাকা ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড পুরনো পদ্ধতির পাশাপাশি নতুন এই প্রযুক্তিতে পরীক্ষামূলকভাবে ফলাফল তৈরি করে আসছে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল তৈরিতে সব বোর্ডই এই প্রযুক্তির ব্যবহার করছে।

নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা স্বীকার করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড তথা আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানূ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা এবার পুরনো প্রযুক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছি সব শিক্ষা বোর্ডে। তবে এই পদ্ধতির পাশাপাশি পুরনো পদ্ধতিতে আগে যেভাবে ফলাফল তৈরি হতো সেভাবেও ফলাফল তৈরি করবে সকল বোর্ড। দুটোর মধ্যে কোনো অসঙ্গতি হচ্ছে কিনা সেটাও আমরা মিলিয়ে দেখছি।’

এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হওয়াতে কি নতুন এই প্রযুক্তিতে ফলাফল? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই নিরাপদ ও নির্ভুল ফলাফল। শিক্ষার্থীরা যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেই বিষয়টিকে মাথায় রেখে আমরা আধুনিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট ফলাফল তৈরিতে কাজ করছি।’

আগামীতেও কি একইভাবে দুই পদ্ধতিতে ফলাফল তৈরি করা হবে? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, ‘ঢাকা ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড দুই বছর ধরে ট্রায়াল বেসিসে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে, এবার সব শিক্ষা বোর্ডে হচ্ছে। যদি আধুনিক এই পদ্ধতি ভালো বলে সবাই একমত হয় তাহলে হয়তো আমরা একটি পদ্ধতিতে চলে যেতে পারি। তবে এখনই এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাচ্ছে না।’

নতুন প্রযুক্তিতে কী সুবিধা আছে? : পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফল তৈরিতে প্রায়ই অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। গত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল তৈরিতেও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের একজন শিক্ষার্থীর একটি বিষয় ছাড়া সব বিষয়ের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে এবং কমিটি রিপোর্টও দিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের পুনঃনিরীক্ষণের সময় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ৩৪টি খাতার নম্বরপত্র বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরও আগে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফলাফলে ১১টি পত্রের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে মামলাও হয় যা এখন বিচারাধীন। নতুন এই প্রযুক্তিতে এমন অনিয়মের কোনো সুযোগ থাকবে না কিংবা কে করেছে তা চিহ্নিত করা সহজ হবে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডসহ সব বোর্ডে এবার আধুনিক প্রযুক্তিতে ফলাফল তৈরি করছি। এই পদ্ধতিতে কোনো ধরনের অনিয়ম করার সুযোগ থাকবে না।’

কী সেই প্রযুক্তি? : দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার সেন্টারে ফলাফল তৈরির কাজ করছেন এমন কর্মকর্তাদের মধ্যে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট বিকাশ চন্দ্র মল্লিক অন্যতম। নতুন এই প্রযুক্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলো ১৯৯৪ সাল থেকে ‘ডস পদ্ধতিতে’ ফলাফল তৈরি করে আসছে। তৎকালীন সময়ে বুয়েট এই পদ্ধতি তৈরি করে দিয়েছিল। তাই সময়ের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় ঘটাতে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ ‘উইন্ডোজ পদ্ধতিতে’ একটি ফলাফল তৈরির প্রোগ্রাম চালু করে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ২০২৪ সালের এসএসসি থেকে এবং কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড গত বছরের এসএসসি থেকে ডস ও উইন্ডোজ উভয় পদ্ধতিতে ফলাফল তৈরি করে আসছে।

উইন্ডোজ পদ্ধতির সুবিধা কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই পদ্ধতিতে ডাটা ইনপুট দেওয়ার পর কমান্ড দ্রুত কাজ করে। একইসঙ্গে এই পদ্ধতিতে লগ ইন সিস্টেম এত উন্নত যে কে কখন কী কাজ করেছে তা রিয়েল টাইমে রেকর্ড হয়ে যায়। অর্থাৎ নিরাপত্তার বিষয়টি সুরক্ষিত থাকছে।

নতুন এই পদ্ধতিতে ফলাফল তৈরির জন্য দেশের সব বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারে যারা কাজ করেন তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে বুয়েটের পক্ষ থেকে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্য : আন্তঃশিক্ষা বোর্ড ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ফলাফল পদ্ধতিকে নির্ভুল ও আধুনিকায়ন করতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাই। এবার দেশের সব শিক্ষাবোর্ডে পুরনো পদ্ধতির পাশাপাশি নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করছি। এ জন্য দেশের সব বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারে যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাথায় অনেক নতুন নতুন চিন্তা কাজ করছে। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে’।

উল্লেখ্য, গত ২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। আগামী ২৯ অক্টোবর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।