স্প্যানিশ ফুটবলের মহারণ ‘এল ক্লাসিকো’য় মহানাট্যময় এক জয় তুলে নিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোলের ওপর ভর করে চলতি লা লিগায় অপ্রতিরোধ্য বার্সেলোনাকে তাদেরই মাঠে ২-১ ব্যবধানে ধূলিসাৎ করেছে লস ব্লাঙ্কোসরা। এই জয়ের ফলে পয়েন্ট টেবিলের লড়াইয়ে নতুন এক রোমাঞ্চ এনে দিল হোসে মরিনহোর দল।
ম্যাচের শুরুতেই বড় ধাক্কা খেয়েছিল রিয়াল শিবির। আচমকা তীব্র জ¦রে আক্রান্ত হয়ে দল থেকে ছিটকে যান নিয়মিত সেরা গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। তার জায়গায় পোস্টের নিচে হঠাৎই সুযোগ পান আন্দ্রেই লুনিন। তবে মরিনহোর দলের ওপর এই ঘটনার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। লুনিন অবিশ্বাস্য কিছু সেভ করে বার্সেলোনার একাধিক সুযোগ ব্যর্থ করে দেন।
ম্যাচে রিয়ালের আক্রমণে ধার ও লক্ষ্য ছিল বার্সার চেয়ে স্পষ্ট। ম্যাচের ৪১তম মিনিটে প্রথম সাফল্য পায় সফরকারীরা। ইয়ান দিওমান্দের বাম দিকের ক্রসে জেরার্ড মার্টিনের দুর্বল ক্লিয়ারেন্স ডি-বক্সে ছুটে চলা এমবাপ্পের গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। প্রথমার্ধের শেষ দিকে বার্সা সমতা ফেরানোর সুযোগ পেলেও তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল তা নষ্ট করেন।
দ্বিতীয়ার্ধের ৬১তম মিনিটে দারুণ এক সেট-পিস থেকে পেদ্রির নিখুঁত পাস খুঁজে নেয় রাফিনহাকে এবং সুনিশ্চিত শটে বল জালে জড়িয়ে স্কোরলাইন ১-১ করেন এই ব্রাজিলিয়ান। সমতায় ফেরার পর রিয়ালের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে বার্সা। তবে নাটকীয়তা তখনো বাকি ছিল।
ম্যাচের ৮৭তম মিনিটে বার্সার বদলি খেলোয়াড় গ্যাব্রিয়েল জেসুসের পা থেকে বল ফসকে গেলে মারাত্মক কাউন্টার-অ্যাটাক চালায় রিয়াল। বদলি নামা এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা গতির ঝড়ে বার্সার রক্ষণ ভেদ করে নিখুঁত পাস বাড়ান এমবাপ্পের উদ্দেশ্যে। ফাঁকা পোস্টে বল ঠেলে দিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে নিজের ১০০তম গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন এই ফরাসি সুপারস্টার। আর চলতি লিগে ১০ ম্যাচে এটি এমবাপ্পের ১১তম গোল।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মৌসুমে এটা বার্সার দ্বিতীয় হার। গত মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির মাঠে হারে ৪-২ গোলে। সেটা এই মৌসুমে টানা ১১ জয়ের পর প্রথম হার। দ্বিতীয় হারের পর বার্সা কোচ হান্সি ফ্লিকের কপালে নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়বে। তবে মরিনিও থাকবেন মেজাজে। রিয়ালে দ্বিতীয় মেয়াদে কোচ হয়ে ১৩ বছর পর এল ক্লাসিকোয় ফিরেই জয় পেলেন মরিনিও। সেটাও এমন ম্যাচে, যেখানে প্রতিপক্ষ দুর্দান্ত ফর্মে থাকায় রিয়ালকে একটু পিছিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বড় মাপের কোচেরা এমন সব ম্যাচেই তো হিসাব ঘুরিয়ে দেন!
ম্যাচ শেষে যথারীতি সংবাদ সম্মেলনেও নিজের ‘স্পেশাল’ উপস্থিতি জানান দেন মরিনহো। হঠাৎ একাদশে আসা লুনিনের পারফরম্যান্স নিয়ে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন না থাকায় রসিকতা করে মরিনহো বলেন, ‘আজ লুনিনকে নিয়ে কেউ প্রশ্ন করল না! কারণ সে দারুণ খেলেছে। লুনিন ভুল করলে নিশ্চয়ই আপনারা প্রশ্ন তুলতেন। আমাদের বিশ্বের সেরা গোলরক্ষক দলে আছে, কিন্তু কোর্তোয়া না থাকায় ছেলেরা কেউ কান্নাকাটি করেনি। তারা ঐক্যবদ্ধ থেকে লড়াই করেছে।’
সেপ্টেম্বরের দুটি অপ্রত্যাশিত হার রিয়ালের শিরোপা স্বপ্ন নিয়ে শুরুতে সংশয় তৈরি করলেও, এল ক্লাসিকোর এই জয় প্রমাণ করল লস ব্লাঙ্কোসরা সঠিক পথেই রয়েছে। মরিনহোর কণ্ঠে তাই দৃঢ়তার সুর, ‘যদি আমরা আজ জিতি আর পরের ম্যাচে গিয়ে হেরে যাই, তবে এর কোনো মূল্য নেই। কারণ রিয়াল মাদ্রিদ কেবল ক্যাম্প ন্যু-তে জেতার জন্য খেলে না, রিয়াল মাদ্রিদ খেলে চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি ঘরে তোলার জন্য।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে রেফারিং ও ভিএআর নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে ছাড়েননি মরিনহো। ৬০তম মিনিটে দিওমান্দেকে বার্সেলোনার জোয়াও কানসেলোর একটি বিপজ্জনক ফাউলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘রেফারি ভালো ম্যাচ পরিচালনা করেছেন, কিন্তু ৬০ মিনিটে ভিএআর যেন ঘুমাচ্ছিল! কানসেলোর ওই ফাউলটা নির্ভেজাল লাল কার্ড ছিল।’
এই জয়ে ১০ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে বহাল আছে বার্সেলোনা। সমান ম্যাচে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে তিন নম্বরে অবস্থান করছে রিয়াল মাদ্রিদ।