মৌসুমের প্রথম ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ আগামীকাল বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত করার কথা। ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে ওঠা ঘূর্ণিঝড় অর্ণব ইতোমধ্যে সুপার সাইক্লোনের তকমা পেয়ে গেছে। তবে এতে আমাদের বাংলাদেশ উপকূলের মাথাব্যথার কারণ নেই। এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত যেমন দেখা যাবে না তেমনি ঝড়েরও প্রভাব থাকবে না। তবে এর দুই দিন পর শুক্রবার থেকে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার বৃষ্টি হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ নামটি বাংলাদেশের দেওয়া। এর অর্থ হলো সাগর। বাংলাদেশের দেওয়া নামের অর্ণব আজ বুধবার ২৮ অক্টোবর সকালে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত করবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ওড়িশায়ও এর প্রভাব পড়বে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো গত বছরের একই দিনে একই এলাকায় আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘মোনথা’। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি উঠেছিল সেদিন মোনথার। এবারও একই দিনে দ্বিগুণ গতিতে একই উপকূলে আঘাত করতে যাচ্ছে অর্ণব। অর্ণবের শক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞ আবহাওয়াবিদদের মধ্যে অন্যতম ড. আবুল কালাম মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি সুপার সাইক্লোনের তকমা পেয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ঘণ্টায় ২১৫ কিলোমিটার গতি উঠলেও আগামীকাল সকালে (বুধবার) উপকূলে আঘাতের সময় গতি কিছুটা কমে আসবে। তবে অর্ণবের প্রভাবে আমাদের উপকূলে হালকা বৃষ্টি হতে পারে।’
এদিকে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১২ নম্বর সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বর্তমানে ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার গতিতে এগোলেও ঝড়টি ধীরে ধীরে শক্তি কমাচ্ছে। উপকূলে আসার সাথে সাথে এর গতিবেগ কমে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। আর এই গতিতেই উপকূলে আঘাত করতে পারে।
এদিকে অর্ণবের প্রভাবে বাংলাদেশ উপকূলের কোথায় কখন বৃষ্টি হতে পারে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোরকাস্টিং কর্মকর্তা আবদুল হামিদ বলেন, ‘খুলনা ও বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় আগামীকাল (বুধবার) হালকা বৃষ্টি হতে পারে। তবে ঘূর্ণিঝড়টি কাল সকালে উপকূলে ওঠার পর স্থল নিম্নচাপ আকারে উত্তর দিকে অগ্রসর হবে। তখন এর প্রভাবে আগামী শুক্রবারের পর থেকে দেশের রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে।’
বঙ্গোপসাগরে বিগত ১৩৫ বছরের ইতিহাসে অক্টোবর মাসে সৃষ্টি হওয়া ৯৭টি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ৭৮টি আঘাত করেছে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা উপকূলে এবং ১৯টির গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ উপকূল। এর সাথে এবার নতুন যুক্ত হলো অর্ণব। যার গতিপথ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল। এর প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
অক্টোবরের যত ঘূর্ণিঝড়
আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে পাওয়া এক উপাত্তে দেখা যায়, ১৮৯১ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত ১৩৫ বছরে বঙ্গোপসাগরে অক্টোবর মাসে ৯৭টি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে। এই ৯৭টি ঝড়ের মধ্যে ৭৮টি ঘূর্ণিঝড়ের গন্তব্য হয়েছে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা উপকূল, বাকি ১৯টি ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত করেছে। আবার বাংলাদেশে আঘাত করা ১৯টি ঘূর্ণিঝড়ের প্রায় সবগুলোর গন্তব্য ছিল দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকা। শুধু অক্টোবর নয়, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের ঘূর্ণিঝড়গুলোর বেশিরভাগের গন্তব্য দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল। ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় কিন্তু গিয়েছিল ভোলার ওপর দিয়ে। এছাড়া ২০০৭ সালের ১৬ নভেম্বরের ‘সিডর’ কিন্তু আঘাত করেছিল বরগুনার ওপর দিয়ে। ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবরের ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ আঘাত করেছিল ভোলায়। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আঘাত করেছিল খুলনায় এবং ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবরের ‘তিতলি’ আবার ওড়িশার ভুবনেশ্বরে আঘাত করেছিল।
উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরে বর্ষার আগে (এপ্রিল-মে) ও বর্ষার শেষে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) এ সময়ে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। চলতি মাসের আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও দুই থেকে তিনটি লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এদের মধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে বলা হয়েছিল। এর আগে গত মাসেও একটি গভীর নিম্নচাপ ভারতের আন্দামান হয়ে মিয়ানমার উপকূলে আঘাত করেছিল।