সাগর-রুনি হত্যা মামলা

হাইকোর্টে অগ্রগতি প্রতিবেদন, জিয়াউল আহসান ও একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জড়িত

১৩ বছরের বেশি সময় আগে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের বরাতে এ তথ্যসংবলিত অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। 

দাখিলকৃত অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে আলোচনায় সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান ও একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে, এসব তথ্যের যাচাই-বাছাইসহ মামলায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তা নির্ধারণে আরও সময় প্রয়োজন।  

তদন্ত ও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দিয়েছে বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ। আগামী বছরের ২৯ এপ্রিল এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুম, খুনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসান বর্তমানে কারাগারে আছেন। 

হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী। রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। সাগর-রুনির পরিবারের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ফ্ল্যাটে নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। ২০১২ সালে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের দেওয়া এক আদেশে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। তবে, শতাধিকবারের বেশি সময় নিলেও র‌্যাব অধস্তন আদালতে প্রতিবেদন দিতে পারেনি। 

বাদীপক্ষের আরজির পরিপ্রেক্ষিতে পর ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এ হত্যা মামলার তদন্তের বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে এ মামলার তদন্ত থেকে র‌্যাবকে সরাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা আবেদন মঞ্জুর করে হাইকোর্ট। পাশাপাশি ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত করে মামলার প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয় আদালত। এরপর কয়েক দফায় ছয় মাস করে সময় দেওয়া হয় টাস্কফোর্সকে। আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি এখন তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সব মিলিয়ে অধস্তন আদালতে এ মামলার প্রতিবেদন দাখিল করতে ১৩০ বারের মতো সময় নেওয়া হয়েছে।  

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, গতকাল শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টকে জানিয়েছে, আসামি জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাড়ি থেকে ৩০০টি সিডি পাওয়া গেছে। সেগুলোতে এসএমএস, কথোপকথন, ভিডিও, অডিও ও অপরাধসংক্রান্ত উপাত্ত থাকতে পারে। ইতোমধ্যে ৯০টির মতো সিডি মূল্যায়ন করা হয়েছে। বাকিগুলো পর্যালোচনা করতে আরও সময় প্রয়োজন। আদালত সময় মঞ্জুর করে আদেশ দেয়। 

পরে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে একটি নাটকীয় মোড় আমরা বলতে পারি। এখন তদন্ত কর্মকর্তার ভিত্তিটা হবে তাদের (প্রসিকিউশনের) তদন্তের আলোকে প্রাপ্য তথ্য, প্রমাণের ভিত্তিতে এই হত্যাকান্ডে সংশ্লিষ্ট যে দুজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা আছে তারাসহ আরও কেউ জড়িত কিনা তা খুঁজে বের করা করা। এটি করতে গেলে সময় লাগবে। আদালতের কাছে বলেছিলাম এজন্য লম্বা সময়ের দরকার। হাইকোর্ট আগামী ২৯ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।’

অ্যাডভোকেট শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যে অগ্রগতির কথা জানিয়েছে, তা মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন প্রসিকিউটরের বরাত দিয়ে তারা বলেছেন, তারা কিছু অগ্রগতি পেয়েছেন। সিডিগুলো যাচাই করতে তারা (রাষ্ট্রপক্ষ) একবছর সময় চেয়েছিলেন। আমরা বলেছি, সিডিগুলো যাচাই করতে এত সময় লাগার কথা নয়। যেহেতু জাতীয়ভাবে এটি গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা দরকার।
 
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, এ হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান ও একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে। জিয়াউলের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা সিডিগুলো যাচাই করা হচ্ছে। এজন্য সময়ের আরজি জানালে হাইকোর্ট আরও ছয় মাস সময় দিয়েছেন।