কুয়াকাটায় বর্ণিল প্রবারণা পূর্ণিমার

পটুয়াখালীর কুয়াকাটাসহ কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে উদযাপিত হচ্ছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। আত্মশুদ্ধি, অশুভ বর্জন এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলার প্রত্যয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রার্থনা, প্রদীপ প্রজ্বালন ও ঐতিহ্যবাহী ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবটি পালন করছেন রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় বর্ণিল আয়োজনে উদযাপিত এই উৎসবের পরিসর ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও উপোসথ শীল গ্রহণের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দিনভর চলে ধর্মীয় দেশনা, সংঘদান, পিঠা নিবেদন, পবিত্র ত্রিপিটক পাঠ এবং সবার মঙ্গল কামনায় সমবেত প্রার্থনা। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালন ও আকাশে রঙিন ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে দুই দিন ধরে চলছে এ আয়োজন।

উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে সমবেত হন রাখাইন নারী-পুরুষ। রাখাইন পল্লীগুলোতে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। তবে আগের মতো বড় পরিসরে আয়োজন না থাকায় অনেক এলাকায় ফানুস ওড়ানোর সংখ্যাও কমেছে।

কলাপাড়া উপজেলায় মোট ১৩টি রাখাইন পল্লী রয়েছে। এর মধ্যে এবার প্রায় অর্ধেক পল্লীতে সীমিত পরিসরে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপিত হচ্ছে। কোথাও অল্পসংখ্যক ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি রয়েছে, আবার কোথাও উৎসবের আয়োজন নেই বললেই চলে। এতে রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবের পরিসর সংকুচিত হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।

নবীনপুরের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা মো. সেরাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে রাখাইন পল্লীগুলোতে ব্যাপক উৎসব হতো। শত শত ফানুসে রাতের আকাশ আলোকিত হয়ে উঠত। এখন সেই দৃশ্য আর তেমন দেখা যায় না।”

কেরানিপাড়ার মাতুব্বর উংচং উচো বলেন, নিজেদের অবস্থান থেকে উৎসবটি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। তবে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আয়োজনও ছোট হয়ে এসেছে। আগে পল্লীগুলোতে অনেক মানুষ বসবাস করতেন। সবাই মিলে বড় পরিসরে উৎসব উদযাপন করতেন। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। তারপরও নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে তাঁরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।

কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো জানান, সকালে বিহারে রাখাইন নারীরা উপস্থিত হয়ে পঞ্চশীল ও উপোসথ শীল গ্রহণ করেন। এরপর ধর্মীয় দেশনা, পিঠা নিবেদন এবং সবার মঙ্গল কামনায় সমবেত প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালন ও ফানুস ওড়ানোর আয়োজন রয়েছে। প্রথম রাতে ১০ থেকে ১২টি ফানুস ওড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উত্তম ভিক্ষু জানান, সকালে ধর্মীয় প্রার্থনা ও শীল গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁদের বিহারে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। দিনভর ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি সন্ধ্যায় ঐতিহ্যবাহী ফানুস উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বেতকাটা রাখাইন পল্লীর ধর্ম বিজয় বৌদ্ধবিহারের সভাপতি মংচো জানান, তাঁদের পল্লীতে প্রথম রাতে ১০ থেকে ১২টি ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গোড়া আমখোলা রাখাইন পল্লীর বিজয়রামা বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ সুচিন্ত মহাথেরো জানান, তাঁদের বিহারেও অন্তত ১০টি ফানুস ওড়ানো হবে। অন্যদিকে, দিয়রাম খোলা পাড়ায় মাত্র চারটি রাখাইন পরিবারের বসবাস থাকলেও সেখানে চার থেকে পাঁচটি ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি রয়েছে।

কুয়াকাটা রাখাইন পল্লী মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমা কুয়াকাটার রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর এ উৎসব দেখতে পর্যটকদের মধ্যে আগ্রহ থাকে। ফানুস ওড়ানোর ঐতিহ্য কুয়াকাটার পর্যটন আকর্ষণকেও সমৃদ্ধ করে। তবে আগের মতো বড় পরিসরে উৎসব না হওয়ায় পর্যটকদের বর্ণিল আয়োজন দেখার সুযোগ কমে গেছে। রাখাইনদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে উৎসবটি আবারও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম হাওলাদার বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে থানার আওতাধীন বৌদ্ধবিহারগুলোতে পুলিশি টহলের পাশাপাশি পরিদর্শন করা হয়েছে। উৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান জানান, রাখাইন সম্প্রদায় যাতে নির্বিঘ্নে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপন করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও উৎসব আয়োজনে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে আত্মশুদ্ধি ও সংযমের বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। গৌতম বুদ্ধের বর্ষাবাসের ঐতিহ্য অনুসারে আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বর্ষাবাস শেষে এ উৎসব উদযাপিত হয়। প্রবারণা পূর্ণিমার পর বৌদ্ধবিহারগুলোতে শুরু হয় মাসব্যাপী কঠিন চীবরদান উৎসব।

কুয়াকাটার রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রবারণা পূর্ণিমা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সম্মিলিত উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা এই উৎসবের বর্ণিল ঐতিহ্য আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।