ক্যানসার চিকিৎসায় কথিত ‘সোনার হরিণ’

জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলেছেন, জিন বা পরিবেশ নয়, ভাগ্য খারাপ হওয়াই অনেক ক্যানসারের মূল কারণ। বহু মানুষ আজীবন ধূমপান করেও লাং ক্যানসারে আক্রান্ত হন না। অনেকেই আবার ধূমপান না করে বা সুস্থ সুন্দর জীবনযাপন করেও ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশে^র কোটি কোটি মহিলার মধ্যে কেউ কেউ ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ভুগছেন বা মৃত্যুবরণ করছেন, অথচ লাখো কোটি মহিলা দিব্বি সুস্থ জীবনযাপন করছেন এটাকে দৈবচক্র বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। শরীরে কোটি কোটি সেল বা কোষ রয়েছে। প্রতিনিয়তই অসংখ্য কোষ ধ্বংস হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে নতুন কোষ তৈরি হয়ে শূন্যস্থান পূরণ করে ফেলে। সেল ডিভিশন বা কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন নতুন সেল প্রস্তুতের এবং বয়োবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি শরীরে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ পরিবর্তন বা ধ্বংস বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফ্রি রেডিক্যাল সৃষ্টির মাধ্যমে সংগঠিত হয়। এই বিক্রিয়া এভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না এই ধ্বংসাত্মক চেইন বিক্রিয়া প্রতিহত এবং বন্ধ করার জন্য একটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্রয়োগ করা না হয়। সেলের ডিএনএ ধ্বংসের অন্যতম কারণ এই চেইন বিক্রিয়া। এ ছাড়াও বিভিন্ন রাসায়নিক বস্তু ক্যানসার সেল সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। এসব পদার্থকে কারসিনোজেন বলা হয়। কোনো রাসায়নিক পদার্থ বা তার অংশ বিশেষ ডিএনএর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বা কারসিনোজেন অথবা তাপের বিকিরণ সেলের ডিএনএকে উদ্দীপিত করার মাধ্যমে তার স্বাভাবিক গঠন এবং কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটিয়ে অস্বাভাবিক সেল তৈরিতে সাহায্য করে। এ সেল তখন আর অন্য কোনো নিয়ন্ত্রণ মানে না। মাস থেকে বছরের মধ্যে এই সেল দ্রুত বৃদ্ধির ফলে নির্ণয়সাধ্য একটি বস্তুপিন্ডে পরিণত হয়। এরূপ বস্তুপিন্ডকে আমরা টিউমার বলে থাকি। টিউমারের আকার আয়তন বৃদ্ধির জন্য সাধারণত অক্সিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহের প্রয়োজন হয়। টিউমারে রক্ত সরবরাহ থাকার কারণে টিউমার থেকে ক্যানসার সেল বিচ্ছিন্ন হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিকর ক্যানসার সেল কর্তৃক আক্রান্ত হয়। এই প্রক্রিয়াকে মেটাস্ট্যাসিস বলা হয়।

সবুজ শাকসবজি এবং ফলমূলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে। ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই এবং বিটা কেরোটিন অত্যন্ত পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট । এসব অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সেলে অবস্থিত অক্সিজেন ফ্রি-রেডিক্যাল বা অন্যান্য ফ্রি-রেডিক্যালকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে ডিএনএ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদার্থের ধ্বংস রোধ করে থাকে। ফলে সেল মারাত্মক ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়। কমলা, লেবু, টমেটো, পেয়ারা, কাঁচামরিচ, ফুলকপি, পালং শাক, কলিজা, কালোজাম, আঙ্গুর, ফুটি, আনারস, জাম্বুরা, স্ট্রবেরি, বাঁধাকপি ভিটামিন-সির উৎকৃষ্ট উৎস। যাবতীয় খাদ্যদ্রব্য বিশেষ করে ভোজ্যতেলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-ই পাওয়া যায়। শাকসবজি ফলমূল ও ভিটামিন-ই-এর খুব ভালো উৎস। হলুদ শাকসবজি ও ফলমূলে রয়েছে প্রচুর বিটা কেরোটিন। সাম্প্রতিককালে পরিচালিত এক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় আঙুর এবং রেডওয়াইন থেকে রেসভারেট্রল নামের একটি উৎকৃষ্ট এবং কার্যকর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আবিষ্কৃত হয়েছে। রেসভারেট্রল চর্ম ক্যানসারের বিরুদ্ধে খুব কার্যকর বলে পরীক্ষায় দেখা যায়। সবুজ চায়ে প্রচুর পরিমাণে পলিফেনোল পাওয়া যায়। এসব পলিফেনোল কোনো কোনো সময় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে ভিটামিন-সি বা ‘ই’-এর চেয়েও বহুগুণ বেশি কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়। টমেটোতে রয়েছে লাইকোপিন নামের একটি চমৎকার কার্যকারিতাসম্পন্ন অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট । কিন্তু তাজা পাকা টেমেটো থেকে লাইকোপিন পাওয়া দুষ্কর বলে রান্নার মাধ্যমে এর আঁশ থেকে লাইকোপিন আলাদা করে নিতে হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত টমেটো খায়, তাদের ক্ষেত্রে ক্যানসারের হার অর্ধেকেরও কম। স্তন, ফুসফুস এবং অন্ত্রের ক্যানসারের ক্ষেত্রে লাইকোপিন অত্যন্ত উপকারী।

দৈনন্দিন জীবনে আমরা তরিতরকারির সঙ্গে প্রচুর রসুন ও পেঁয়াজ খেয়ে থাকি। অনেকে বিভিন্ন রোগের প্রতিকার হিসেবেও কাঁচা রসুন বা পেঁয়াজ খেয়ে থাকেন। বলা হয়ে থাকে, রসুনের বহুগুণ। রসুন এবং পেঁয়াজে অ্যালাইল সালফাইড নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। অ্যালাইল সালফাইড প্রো-কারসিনোজেন থেকে কারসিনোজেন বা অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য বা তাদের ভগ্নাংশ প্রক্রিয়াকরণে বা প্রস্তুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এনজাইমের উৎপাদন প্রতিহত করার মাধ্যমে ক্যানসার সৃষ্টি প্রতিহত করে। অ্যালাইল সালফাইড তৈরি হওয়ার জন্য রসুন বা পেঁয়াজ ছোট ছোট করে কেটে বা পিষে ১০ থেকে ২০ মিনিট উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখা প্রয়োজন। কাটা রসুন বা পেঁয়াজের চেয়ে রস খাওয়া উত্তম। ফুলকপি, বাঁধাকপি এবং ব্রোকলিতে রয়েছে সালফোরাফেন নামের এক ধরনের রাসায়নিক বস্তু। সেলের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ব্যর্থ হলে ক্যানসার সেল বিভক্তির কারণে অবস্থার অবনতি ঘটার বিরুদ্ধে প্রথম কাজ হলো এই, ক্যানসার সেলকে ধ্বংস করা অথবা এর বিভক্তি রোধ করা। কর্ণ তেলের ওমেগা-৬-ফ্যাটি অ্যাসিড সেল বিভাজন ত্বরান্বিত করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে যেসব তেলে ওমেগা-৬-ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, তা বর্জন করা বাঞ্ছনীয়। সেলের বিভাজন রোধের মাধ্যমে ক্যানসার প্রতিহত করার জন্য মাছের তেলের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড খাওয়া উচিত। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সেল থেকে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসডিকে বিতাড়িত করে সেল বিভাজনের গতি ও পরিমাণ হ্রাস করে দেয়।

রিপ্রোডাকটিভ সেলগুলো সাধারণত ক্যানসারপ্রবণ হয়। কারণ এসট্রোজেনের মতো সেক্স হরমোন এসব সেলের গঠন ও বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। মহিলাদের স্তনের সেল গঠন ও বৃদ্ধিতে এসট্রোজেনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কারণে মহিলারা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয় বেশি। সয়া খাবারে আইসোফ্ল্যাভোন নামে এক জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা এসট্রোজেন রেসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এসট্রোজেনের কার্যকারিতাকে প্রতিহত করার মাধ্যমে ক্যানসার সৃষ্টির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর জন্য সবার বেশি করে সয়া খাবার খাওয়া উচিত।

সব রকম প্রতিরক্ষা ব্যূহ ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার কারণে ক্যানসার সেল বিভাজন ও বৃদ্ধি লাভ করে টিউমারে পরিণত হয়ে গেলে আর করণীয় বেশি কিছু থাকে না। টিউমার সেলের জীবনধারণ এবং বৃদ্ধি লাভের জন্য রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে অক্সিজেন এবং পুষ্টি গ্রহণ আবশ্যক। টিউমার সেলে বিদ্যমান গ্রোথফ্যাক্টরের কারণে টিউমারে নতুন নতুন রক্তনালি তৈরি হয়। এসব রক্তনালির মাধ্যমে টিউমার সেল অক্সিজেন এবং পুষ্টি পায় বলে টিউমার আয়তনে বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে এসব রক্তনালির মাধ্যমে রক্ত টিউমার থেকে ক্যানসার সেল শরীরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়, যা হলো জীবনের জন্য অতি ভয়ংকর। এই পরিস্থিতিতে হলুদের কুরকুমিন এবং আঙুরের রেসভারেট্রল গ্রোথফ্যাক্টর দমনের মাধ্যমে নতুন রক্তনালি প্রস্তুত প্রতিহত করে থাকে। নতুন রক্তনালি তৈরি হতে না পারলে টিউমার সেলে রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছাতে পারে না এবং টিউমার থেকে ক্যানসার সেল শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়াতে পারে না বলে অবস্থা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে করে ক্যানসারের রোগী বেশি দিন না বাঁচলেও আয়ু কিছুদিন বৃদ্ধি করা সম্ভব। ক্যানসার প্রতিরোধ এবং প্রতিকারে অ্যাসকরবিক অ্যাসিড বা ভিটামিন সি-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে স্কার্ভি রোগের প্রতিকারে ভিটামিন সি ব্যবহ্নত হয়ে এলেও ক্যানসারের ক্ষেত্রে ভিটামিন-সি-এর উপযোগিতার কথা মানুষ জানতে পারে সাম্প্রতিককালে । ভিটামিন-সি শরীরে কোলাজেন তৈরির মাধ্যমে সেলের গাঁথুনি মজবুত রাখে। কোলাজেনের ভূমিকা ইট বা কন্ক্রিটের মধ্যবর্তী স্থানে চুন-সুড়কি বা বালু-সিমেন্টের মতো। ভিটামিন-সি কোলাজেন তৈরির মাধ্যমে সৃষ্ট মজবুত দেয়াল দিয়ে টিউমরকে বৃত্তাবদ্ধ করে রেখে শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্যানসার সেলের দ্রুত বিস্তার প্রতিহত করে। অন্য এক তত্ত্বে বলা হয়েছে, ভিটামিন-সি শরীরে ক্যানসার সৃষ্টিকারী ভাইরাসকেও কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে পারে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, টিউমার অপারেশনের ক্ষেত্রে ভিটামিন-সি ক্ষত পূরণের সময় অতি দ্রুত কমিয়ে আনতে সক্ষম। বিভন্ন ইপিডেমিওলজিক্যাল পরীক্ষা এবং পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে গৃহীত ভিটামিন-সি ব্রেস্ট, ব্লাডার, সারভিক্যাল, কোলোরেক্টাল, লাং, প্যানক্রিয়াস, প্রোস্টেট এবং অন্ত্রের ক্যানসারে কার্যকর এবং ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে। ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত ভিটামিন-সি গ্রহণ অতি উপকারী।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্রমোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহু জটিল রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকারে যত সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তুলনামূলকভাবে ক্যানসারের বেলায় তত হয়নি। ক্যানসার চিকিৎসার জন্য সেই কথিত ‘সোনার হরিণ’ বা ‘ম্যাজিক বুলেট’-এর সন্ধানে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা পুরো উদ্যোগে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে সেই মোক্ষম ম্যাজিক বুলেটটির সন্ধান মিলবে। খাদ্যদ্রব্য হয়তো ক্যানসার পুরোপুরি নির্মূল বা উচ্ছেদ করতে পারবে না। কিন্তু উপযুক্ত খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে নিঃসন্দেহে মানবদেহে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুলাংশে কমে আসবে।

লেখক : জনস্বাস্থ্য ও ওষুধ বিশ্লেষক। সাবেক ডিন ফার্মেসি অনুষদ, ঢাবি। বর্তমানে অধ্যাপক, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি

drmuniruddin@gmail.com