দোকানের তাকে চাল নেই, চিনির বস্তাও খালি। ডাল, ভোজ্যতেল আর জ্বালানি তেলের মজুদও ফুরিয়ে আসছে। কয়েক দিন কোনো পণ্যবাহী গাড়ি না আসায় নতুন করে দোকান ভরারও উপায় নেই। অকটেন সংকটে সাজেকে পানি পরিবহনও বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা জরুরি ওষুধই বা কোথায় মিলবে এমন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে দুর্গম সাজেকের বাসিন্দাদের। পাঁচ দফা দাবিতে সড়ক অবরোধের গতকাল মঙ্গলবার ষষ্ঠ দিন শেষেও অবরোধ প্রত্যাহার নিয়ে হয়নি সুরাহা, এতে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। পর্যটকদের কোলাহলে মুখর সাজেক এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ; খাবার ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটের সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে গত ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। এতে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে দুর্গম এলাকার সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর। পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় কাজ করা কর্মচারীরাও পড়েছেন খাবার সংকটে। আয় বন্ধ থাকলেও অনেকেই কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ বা ব্যবস্থা কোনোটিই সহজে মিলছে না।
সাজেক পর্যটনকেন্দ্রের মুদি দোকান তারিং টেলিকম অ্যান্ড ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক জনসিম চাকমা জানান, তার দোকানে চাল ও চিনি শেষ হয়ে গেছে। আশপাশের দোকানগুলোতেও ডাল, সয়াবিন তেল এবং ডিজেল-অকটেনের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। সর্বশেষ ২১ অক্টোবর পণ্যবাহী গাড়ি সাজেকে পৌঁছেছিল। এরপর নতুন করে পণ্য না আসায় দোকানগুলোতে সংকট ক্রমেই বাড়ছে।
এই সংকট শুধু দোকানদার বা পর্যটন ব্যবসায়ীদের নয়। সাজেক ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি অনিত্য ত্রিপুরা জানান, তার ওয়ার্ডে প্রায় দেড় হাজার পরিবারের বসবাস। শুধু সাজেক পর্যটনকেন্দ্রেই রয়েছে ৫০০টির বেশি পরিবার। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি জরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। ফলে অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাজেকের মাচাঙ নক নামে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন মিরাজ আলী। রেস্টুরেন্টের নিরাপত্তার কথা ভেবে কর্মস্থলে থেকে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখন খাবার, পানি ও জ্বালানির সংকট তার মতো কর্মীদের জীবন কঠিন করে তুলেছে। মিরাজের ভাষায়, কয়েক দিন কোনো গাড়ি না আসায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিক-কর্মচারী নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও চরম সংকটে পড়েছেন।
স্থানীয় দোকানদার রবার্ট ত্রিপুরা বলেন, পর্যটকদের ওপরই আমাদের আয় পুরোপুরি নির্ভরশীল। তারা আসতে না পারায় আয় বন্ধ রয়েছে। তবে মূল সমস্যা হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মজুদ শেষ হয়ে আসছে। এভাবে আর কয়েকটা দিন গেলে সাজেকের যারা রয়েছেন তাদের খাদ্য সংকটে মরতে হবে। তিনি বলেন, চাল হয়তো এখানে পাওয়া যায়, কিন্তু জ¦ালানি তেল, ভোজ্য তেল, চিনি, দুধ, চা পাতাসহ নানান জিনিসের সংকট বাড়ছে। এছাড়া এখানে পানি যেখান থেকে আনতে হয় জ¦ালানি তেলের অভাবে তারাও পানি আনতে পারছে না।
অবরোধে স্থবির হয়ে পড়েছে সাজেকের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিও। রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ১৩৫টি রিসোর্ট ও কটেজ, প্রায় ৩০টি রেস্তোরাঁ এবং শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকান পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটক না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু কর্মচারীদের বেতন ও প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ থেমে নেই। পর্যটন ব্যবসায়ী পারভেজ খান বাপ্পী জানান, অনেক কর্মচারী এখনো সাজেকে অবস্থান করছেন। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এদিকে সংকট নিরসনে গত সোমবার বিকেলে সাজেক ইউনিয়নের উজো বাজারে প্রশাসনের সঙ্গে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের বৈঠক হয়। বেলা ৩টা থেকে বিকেল পৌনে ৬টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আলোচনা হলেও প্রধান দাবি বাস্তবায়নে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা জানান, সরকার তাদের মূল দাবি বাস্তবায়নে সময় চেয়েছে। তবে নির্দিষ্ট ও নিশ্চিত আশ্বাস না পাওয়ায় অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকার আবার আলোচনায় বসতে চাইলে তারা প্রস্তুত রয়েছেন।
রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান বলেছেন, খাদ্যসংকট দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য আইনশঙৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রশাসনও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে আলোচনা চললেও সাজেকের মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী। রাজনৈতিক দাবির সমাধান কখন হবে, তা অনিশ্চিত। কিন্তু এর মধ্যে শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ মানুষ ও দুর্গম গ্রামের পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা অপেক্ষা করতে পারে না। তাই অবরোধের সমাধানে আলোচনার পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছানোর বিকল্পব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার এই পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার না দিলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।