‘আয়রে আয় টিয়ে, নায়ে ভরা দিয়ে/না’ নিয়ে গেল বোয়াল মাছে, তাই না দেখে ভোঁদড় নাচে/ওরে ভোঁদড় ফিরে চা, খোকার নাচন দেখে যা।’ ছোটবেলায় এই লোকছড়াটি পড়েননি এমন মানুষ আমাদের দেশে খোঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ মানুষই জানেন না লোকছড়ায় উল্লেখিত এই ভোঁদড় কী? নানা কারণে আমাদের দেশের পরিবেশ-প্রকৃতি থেকে বৈচিত্র্যময় প্রাণী ভোঁদড় হারিয়ে যাচ্ছে। এটি এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।
ভোঁদড়ের ইংরেজি নাম Smooth-coated Otter আর বৈজ্ঞানিক নাম Lutrogale perspicillata। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থান ভেদে এ প্রাণীটি উদবিড়াল, উদ, ধেড়ে, উদবিলাই, মাছ নেউল ইত্যাদি নামেও পরিচিত। এক সময়ে ছিল আবহমান বাংলার প্রতিটি অঞ্চলে জেলেদের মাছ শিকারের অনন্য সহযোগী ছিল এই ভোঁদড়। দেখতে বেজির মতো অদ্ভুত এ প্রাণীটি সাঁতারে সেরা। নদীর প্রবল স্রোতেও তারা অবলীলায় সাঁতার কাটতে পারে। পানির তলদেশে ডুব দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। ভোঁদড়ের শরীরে বিশেষ এক ধরনের গন্ধ রয়েছে। তাদের প্রিয় খাদ্য হলো কাঁচা মাছ। এরা একসঙ্গে সদলবলে থাকতে পছন্দ করে। পুরুষ ভোঁদড়দের তেজ স্ত্রী ভোঁদরদের থেকে অনেক বেশি। এ জন্যই পুরুষ ভোঁদড়দের ‘ডগ’ আর স্ত্রী ভোঁদড়দের ‘বিচ’ নামে ডাকা হয়।
খাদ্যের সন্ধানে ভোঁদড় নদীর পানির ৬০ ফুট গভীর পর্যন্ত ডুব দিতে পারে। তারা পানির নিচে আট মিনিট পর্যন্ত শ্বাস বন্ধ করে থাকতে পারে। আমাদের দেশের সিলেট, খুলনা, নড়াইলসহ পূর্বাঞ্চলীয় হাওরাঞ্চল, নদ-নদী, খাল, বিল, পুকুরের পাশে, প্লাবনভূমি, খানাখন্দে এবং উপকূলীয় জেলাগুলোতে প্রচুর ভোঁদড়ের দেখা মিলত। এখন ভোঁদড়ের দেখা পাওয়া যেন অনেকটাই ভাগ্যের ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জেও এখন আর আগের মতো ভোঁদড়ের দেখা পাওয়া যায় না। আমাদের পরিবেশ-প্রকৃতি থেকে এ প্রাণীটি অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে দক্ষিণ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশে এখনো প্রচুর পরিমাণ ভোঁদড়ের দেখা মিলে বলে জানা গেছে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের রূপসপুর গ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে রয়েছে একটি ভোঁদড়। এটি সংগ্রহের ব্যাপারে ওই ফাউন্ডেশনের পরিচালক সঞ্জিত দেব বলেন, ‘আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগে ২০১৬-২০১৭ সালের দিকে সুবিস্তৃত হাইল হাওরে জেলেরা মাছ ধরতে গেলে তাদের জালে অসুস্থ অবস্থায় ভোঁদড়টি আটকা পড়ে। পরে খবর পেয়ে আমরা উদ্ধার করে নিয়ে আসি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানের পর সেই সময় থেকেই এটিকে সেবা ফাউন্ডেশনে রেখে লালন-পালন করা হচ্ছে। শুধুমাত্র সঙ্গীর কারণে এটিকে কোথাও অবমুক্ত করা যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই উভচর প্রাণীর প্রিয় খাবার কাঁচা মাছ। এরা বসবাস করে জলাশয়ের পাশে বন-জঙ্গলে। আমাদের দেশে কিছু ভ্রান্ত ধারণার ফলে মানুষ অবাধে ভোঁদড় মেরে নিঃশেষ করে ফেলছে। ভ্রান্ত ধারণাটি হলো এরা পুকুর বা জলাশয়ের মাছ খেয়ে শেষ করে ফেলে। অন্যদিকে কিছু মানুষের ধারণা ভোঁদড়ের চামড়া অনেক বেশি দামি। তাই লোভের বশবতী হয়ে এদের নির্বিচারে হত্যা করছে। এ ছাড়া তাদের প্রয়োজনীয় আবাসভূমি ধ্বংস ও পরিবর্তনই ভোঁদড়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার আরও একটি বড় কারণ।’
ময়মনসিংহ মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক চয়ন বিকাশ ভদ্র ভোঁদড় সম্পর্কে বলেন, ‘জলজ পরিবেশ ধ্বংসের কারণে এখন ভোঁদড় বা উদবিড়াল অনেকটা বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশের গ্রামের বড় বড় পুকুর, দীঘি, বিল ও হাওরে এদের অবাধ বিচরণ এখন তেমন একটা চোখে পড়ে না। সাধারণ মানুষের অসচেতনতায় এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। তবে সুন্দরবনে ভোঁদড় এখনো বেঁচেবর্তে আছে। প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় প্রাণী ভোঁদড় রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।’