বেবিচকের ৫০০ কোটির স্বপ্নভঙ্গ

ঢাকা ও দেশের প্রধান সড়কগুলোর যানজট এড়িয়ে দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিদেশি বিনিয়োগ, ভিআইপি, করপোরেট নির্বাহী এবং মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি স্থানান্তরের কথা চিন্তা করে হেলিপোর্ট নির্মাণের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল বেবিচক। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই উচ্চাকাক্সক্ষী স্বপ্ন লালফিতার দৌরাত্ম্যে আটকা পড়ে আছে। এ নিয়ে বেবিচকের আলোচনা চললেও কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। অনেকটা অনিশ্চয়তার মধ্যেই পড়েছে প্রকল্পটি।

বেবিচকসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের একটি পূর্ণাঙ্গ হেলিপোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই কাওলায় প্রায় ১০০ একর জায়গায়ও চূড়ান্ত করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ৫০০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু অর্থের অভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সংস্থাটি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উদ্যোগ নিলেও সবুজসংকেত মেলেনি।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুনরায় হেলিপোর্ট নির্মাণের বিষয়ে বৈঠক হলেও সুরাহা হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত বেড়ে যাওয়া অসহনীয় যানজট এড়াতে সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী, চলচিত্র নির্মাতা, হাসপাতাল মালিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা খুঁজছেন বিকল্প পথ। এর ধারাবাহিকতায় করপোরেট লেভেলে বৃদ্ধি পাচ্ছে হেলিকপ্টারের ব্যবহার। সিনেমার শুটিং, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, রোগী বহন, করপোরেট মিটিং থেকে শুরু করে নানা কাজে হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে মানুষ। কিন্তু প্রতিবার উড্ডয়নের জন্য সিভিল অ্যাভিয়েশন থেকে অনুমতি নিতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটেও মাঝেমধ্যে ফ্লাইট বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

হেলিপোর্টটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান। এ জন্য একটি বাজেটও ধরা হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়। বিমানবন্দরের গোলচত্বর লাগোয়া দক্ষিণে রেললাইনের পূর্ব পাশে বেবিচকের নিজস্ব প্রায় ১০০ একর জমিতে হেলিপোর্ট নিমার্ণের সিদ্বান্ত নেয়। এর আগে বিমানবন্দরের দক্ষিণাংশে বেবিচকের পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি হেলিকপ্টার সংস্থাগুলো নিজস্ব উদ্যোগে স্থাপনা তৈরি করে তাতে অপারেশনাল কাজ চালায়। পরে থার্ড টার্মিনালের কারণে সরিয়ে নেওয়া হয় বিমানবন্দরের উত্তর পাশে। বর্তমানে বিমানবন্দরের উত্তর পাশে হেলিকপ্টারগুলো রাখা হচ্ছে।

জনপ্রিয় হয়ে উঠছে হেলিকপ্টার সেবা : হেলিপোর্ট নির্মাণে স্থবিরতা দেখা গেলেও বাস্তবতা হলো দেশে বাণিজ্যিকভাবে হেলিকপ্টার ব্যবহারের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়ছে। যানজট এবং দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে হেলিকপ্টার এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং ব্যবসায়িক ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তায় দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে যানযটমুক্ত যাতায়াতের জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার প্রাধান্য দিচ্ছেন। ঢাকার বাইরের দুর্গম এলাকা থেকে মুমূর্ষু রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য হেলিকপ্টারই একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে। বিয়ে, পর্যটন এলাকা পরিদর্শন এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে হেলিকপ্টারের ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। বর্তমানে দেশে ডজনখানেকেরও বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার সেবা দিচ্ছে। চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও সুনির্দিষ্ট এবং কেন্দ্রভিত্তিক কোনো হেলিপোর্ট না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানকে শাহজালাল বিমানবন্দর বা অস্থায়ী বিভিন্ন স্থানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল উপায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

নির্মাণে আর্থিক সংকট : হেলিপোর্ট প্রকল্পের ব্যর্থতার পাশাপাশি বেবিচকের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাছে পাওনা বিশাল অঙ্কের টাকা। অতীতে সেবা দিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া একাধিক দেশীয় এয়ারলাইনস (ইউনাইটেড, রিজেন্ট, জিএমজি) বেবিচকের কয়েক হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। ওই পাওনা টাকা আদায়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। বকেয়া চার্জ আদায়ে যখন কঠোর বিধান করছে বেবিচক, তখন দেশের পাঁচ এয়ারলাইনসের কাছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পাওনা সাত হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮৩ শতাংশই রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে। বিপুল অঙ্কের এই বকেয়া আদায়ে নতুন বিধিমালা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। অথচ আইনে আছে বিমানবন্দরের সেবা ও বিমান চলাচলসংক্রান্ত চার্জ দীর্ঘদিন বকেয়া রাখলে সংশ্লিষ্ট বিমান জব্দ, নিলাম কিংবা সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে পারবে কর্তৃপক্ষ। এ জন্য ১২০ দিনের বকেয়ার পর ৩০ দিনের নোটিশ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে নতুন ‘বেসামরিক বিমান চলাচল বিধিমালা ২০২৬’-এ। কিছু এয়ারলাইনস নিয়মিত নেভিগেশন, ল্যান্ডিং ও রুটিং ফি পরিশোধে বিলম্ব করায় বকেয়ার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছেই।

কত অর্থ পাবে বেবিচক : বেবিচকের তথ্য বলছে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে পাওনা ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দরের বিলই ৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। শাহ আমানতের ১ হাজার ৭৮১ কোটি, উসমানীতে ৬০৩ কোটি টাকার বিল আছে। জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে বেবিচকের পাওনা ৪১১ কোটি টাকা, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কাছে ৪৫৪ কোটি এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইনসে ৩৯১ কোটি ও নভোএয়ারের কাছে ১৩ কোটি টাকা। ইউএস-বাংলা ও এয়ার অ্যাস্ট্রার কাছে বর্তমানে কোনো বকেয়া নেই। বেবিচকের এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানের বকেয়া ছাড় পাওয়ার নজিরও রয়েছে। ২০০৮ সালে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার দেনার পর ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকার সারচার্জ মওকুফ করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ২০১৭ সালেও বিমানের ১৭০০ কোটি টাকার বকেয়া মওকুফ করা হয়।

সহায়তা চাওয়া হচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে : এ প্রসঙ্গে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাত যখন ক্রমাগত বড় হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে করপোরেট খাত যখন আকাশপথ ও হেলিকপ্টার সেবার দিকে ঝুঁকছে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা পরিষেবা দিতে না পারা দুংখজনক। হেলিপোর্ট ঘিরে যে স্বপ্ন বেবিচক দেখেছিল, তা যেন কেবল একটি ফাইলবন্দি নকশায় সীমাবদ্ধ না থাকে। কার্যকর নীতিমালা, বকেয়া টাকা উদ্ধার এবং অব্যবহৃত অবকাঠামোর দ্রুত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে অ্যাভিয়েশন পর্যটন এবং জরুরি আকাশ যোগাযোগব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হেলিপোর্ট নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। জায়গায় নির্ধারণ করাসহ আনুষঙ্গিক কাজ এগিয়ে নিলেও অর্থের অভাবে তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। গত মাসেও হেলিপোর্ট নির্মাণ নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক হলেও কোনো ফল আসেনি। এত টাকা কোত্থেকে আসবে তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। বৈঠকে সবাই একমত হন হেলিপোর্ট নির্মাণের জন্য জাইকাসহ আরও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। শাহজালালেল উত্তর পাশে হ্যাঙ্গার ভবনে উড়োজাহাজের পাশাপাশি বেসরকারি হেলিকপ্টারগুলো রাখা হচ্ছে। এতে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের অবহিত করা হয়েছে।

হেলিকপ্টারের যাত্রী ভাড়া : বেবিচক সূত্র জানায়, বাংলাদেশে দুই ধরনের হেলিকপ্টার চালু রয়েছে। এক ইঞ্জিন ও দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট। এক ইঞ্জিনের হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ার সময় ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার টাকা, ভূমিতে ঘণ্টা প্রতি পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা। এতে চারজন যাত্রী বহন করা যায়। তা ছাড়া বড় এক ইঞ্জিনের হেলিকপ্টারের ভাড়া এক লাখ থেকে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। এ হেলিকপ্টারে বসতে পারেন ছয়জন যাত্রী। দুই ইঞ্জিনের হেলিকপ্টারের ভাড়া দুই লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা। এতে সর্বোচ্চ সাতজন যাত্রী যেতে পারেন। তবে রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে ভাড়ার ওপর ৩০ শতাংশ কর ছাড় দেওয়া হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চার সিটের একটি হেলিকপ্টারের ভাড়া ৬৬ হাজার থেকে এক লাখ ৮৫ হাজার টাকা। মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুর অঞ্চলে লোকাল রাইড বা ইভেন্টভিত্তিক প্যাকেজ সেবার ভাড়া ধরা হয় ৯৫ হাজার থেকে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

পড়ে আছে ১০০ একর জায়গা : বেবিচকের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে হেলিপোর্ট করার অভিজ্ঞতা নেই কারও। আইকাও গাইডলাইন অনুযায়ী সব ধরনের শর্ত মেনেই হেলিপোর্ট নির্মাণ করতে হয়। কাজেই পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখানে বিদেশি কোম্পানির সহযোগিতা নিতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও আবেদন করা হয়। ভালো সিগন্যাল না আসায় বিষয়টি থমকে যায়। হেলিপোর্ট নির্মাণ করতে পারলে বেবিচকের আয় বাড়বে বহুগুণ। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। হেলিপোর্টের জন্য প্রায় ১০০ একর জায়গা পড়ে আছে। হেলিপোর্টটি তৈরি করতে পারলে ৮০টির মতো হেলিকপ্টার ধারণের সক্ষমতা থাকবে। একসঙ্গে দুটো হেলিকপ্টার ওঠানামার সুযোগ থাকবে।

কতটি হেলিকপ্টার চলছে : বর্তমানে দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হেলিকপ্টার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় কোম্পানি হলো সিকদার গ্রুপের আরএনআর এয়ারলাইনস। তাদের ৭টি হেলিকপ্টার আছে। এ ছাড়া সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইনসের ৪টি, বসুন্ধরা গ্রুপের ৩টি, স্কয়ার গ্রুপের ৩টি, পিএইচপি গ্রুপের ১টি, বাংলা ইন্টারন্যাশনালের ১টি, বিআরবি ক্যাবলের ২টি, মেঘনা গ্রুপের ৩টি, ইমপ্রেস অ্যাভিয়েশনের ২টি, এমএএস বাংলাদেশের আছে ২টি হেলিকপ্টার। শাহজালালে আরঅ্যান্ডআর, বিআরবি ক্যাবল, বাংলা ইন্টারন্যাশনাল, পিএইচপি এয়ারলাইনসের নিজস্ব হ্যাংগার আছে। নীতিমালার আলোকেই কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা চালাচ্ছে। নীতিমালায় বলা আছে হেলিকপ্টার উড্ডয়নের ৪৮ ঘণ্টা আগে সিভিল অ্যাভিয়েশনকে অবহিত করতে হয়। কারণ হেলিকপ্টারের নির্দিষ্ট কোনো রুট নেই। এ কারণে কোনো হেলিকপ্টার আকাশে উড্ডয়ন করলে টাওয়ার প্রস্তুত রাখতে হয়, যাতে সহজে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়।