মাও সেতুংকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে

মাঠের বাইরের এক চরম বিতর্কিত মন্তব্যে বড় ধরনের আইনি ও বাণিজ্যিক সংকটে পড়েছেন ফরাসি ফুটবল সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মাও সেতুংকে ‘ডিক্টেটর’ বা স্বৈরশাসক হিসেবে অভিহিত করে চীনের সমর্থক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্র্যান্ড ও চীনা সরকারের রোষানলে পড়েছেন এই ফরোয়ার্ড। 

কোটি কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন চুক্তি বাতিল, রাষ্ট্রীয় টিভিতে সম্প্রচার নিষিদ্ধ হওয়ার মুখে শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চেয়েছেন এমবাপ্পে। 

ঘটনার সূত্রপাত: একটি ট্রোল ভিডিও ও এমবাপের মন্তব্য

বিতর্কের সূত্রপাত ফরাসি সতীর্থ ওরেলিয়েন চুয়ামেনির সঞ্চালিত অনলাইন টকশো ‘দ্য ব্রিজ’-এ। শো-তে এমবাপ্পেকে তাকে নিয়ে তৈরি সেরা বা পছন্দের ইন্টারনেট মিম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি হেসে ওঠেন। ফুটবল বিশ্বে প্রভাব ও কর্তৃত্বের কারণে সতীর্থ ও সমর্থকদের কাছে এমবাপের ডাকনাম হয়ে উঠেছে ‘ডিক্টেটর’। সেই মিমের রেফারেন্স টেনে অনুষ্ঠানে এমবাপ্পে বলেন, ‘যে মেমেটা দেখে আমি সবচেয়ে বেশি হাসি, সেটা হলো এক লোকের ভিডিও, আমার মনে হয় তিনি একজন চীনা একনায়ক ছিলেন। সেখানে তাঁর মুখের ওপর আমার মুখ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ 

টকশো চলাকালে এমবাপ্পের মুখের ওপর বসানো যে ছবিটি দেখানো হয়, সেটি ছিল চীনের গণপ্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুংয়ের। মাও সেতুংকে চীনে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা হয় এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে তাঁর অবদান স্পর্শকাতর এক বিষয়। কিন্তু এমবাপ্পে উক্ত সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবেই মাও সেতুংকে ‘চীনা একনায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে উক্ত ভিডিওর ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই চটে যায় চীনের নাগরিক ও ফুটবল সংস্থাগুলো।

চীনা ব্র্যান্ডগুলোর চুক্তি বাতিল ও সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ

ভিডিওটি চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ডংকিউডি’ এবং ‘ওয়েইবো’তে ভাইরাল হওয়ার পর চীনের জনগণ এটিকে “জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত” হিসেবে চিহ্নিত করে। তীব্র প্রতিবাদের পর একের পর এক চীনা ব্র্যান্ড এমবাপের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। চীনের বৃহত্তম ডেইরি প্রতিষ্ঠান ‘মেংনিউ’, পানীয় প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘ডংপেং’ এবং চিজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘মিল্কগ্রাউন্ড’ সরাসরি এমবাপ্পের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা ছিন্ন করে।

চীনের প্রতিষ্ঠান ডংপেং এর ইলেকট্রোলাইট পানীয়ের বোতলে এমবাপ্পের ছবি, সংগৃহীত

এক যৌথ বিবৃতিতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘চীনা জনগণের আবেগ ও জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে, এমন যেকোনো মন্তব্য বা আচরণের বিরুদ্ধে আমাদের শূন্যসহনশীল নীতি রয়েছে। আমরা এর তীব্র বিরোধিতা করছি।’

এখানেই শেষ নয়, চীন সরকারের গণমাধ্যম তদারকি সংস্থা নির্দেশ জারি করে যে চীনের রাষ্ট্রীয় টিভি ‘সিসিটিভি’ -তে কিলিয়ান এমবাপ্পের বা লা লিগার কোনো সংবাদ ও ম্যাচ সম্প্রচার করা হবে না। চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘রেডনোট’-এ এমবাপের অ্যাকাউন্ট নতুন অনুসারী গ্রহণ করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক ব্রিফিংয়ে মন্তব্য করেন, ‘চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত দেয় এমন কোনো কাজ বা বক্তব্য চীনা সমাজের সব স্তরের মানুষের তীব্র প্রতিবাদের মুখোমুখি হবে, এটাই স্বাভাবিক।’

এমবাপ্পের চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবো অ্যাকাউন্ট ব্লক করার ছবি নিয়ে তৈরি ফটো ইলাস্ট্রেশন, ছবি: সংগৃহীত 

অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় এমবাপ্পে ও লা লিগার প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা

চীনে এমবাপের কোটি কোটি ডলারের বিলবোর্ড, স্পন্সরশিপ এবং রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগার বিশাল বাজার ধ্বংসের মুখে পড়ায় তড়িঘড়ি করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইত বাধ্য হন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। মঙ্গলবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ভুল স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমার মন্তব্যটি অত্যন্ত অবিবেচকের মতো হয়েছে। আমি এখন বুঝতে পারছি যে এটি চীন এবং বিশ্বজুড়ে থাকা চীনা সম্প্রদায়ের বহু মানুষের মনে আঘাত হেনেছে। আমার বক্তব্যে যারা ব্যথিত হয়েছেন, আমি তাদের সবার কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাচ্ছি। চীনা জনগণ এবং তাদের ইতিহাসের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে; যা ঘটেছে তার জন্য আমি সত্যি অনুতপ্ত।’ 

এমবাপ্পের ব্যক্তিস্বার্থের এ ভুলের খেসারত যাতে পুরো লিগকে দিতে না হয়, সে জন্য স্প্যানিশ ফুটবল লিগ ‘লা লিগা’ আলাদাভাবে এক বিবৃতি জারি করে চীনা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে অনুনয় প্রকাশ করে। লা লিগার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘কিলিয়ান এমবাপ্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে চীনা ভক্তদের মনে যে ক্ষোভ ও আঘাত লেগেছে, তার জন্য লা লিগা গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করছে। এই মন্তব্যগুলো একেবারেই তাঁর ব্যক্তিগত মতামত এবং লা লিগার কোনো ভাবমূর্তি বহন করে না। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের জায়গা থেকে লা লিগা এবং এর সব ক্লাবের পক্ষ থেকে আমরা চীনা জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ 

পরবর্তীতে লা লিগার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের তেবাস স্পেনে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও জিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং চীনে লা লিগার কৌশলগত চুক্তিগুলো অক্ষুণ্ণ রাখার অনুরোধ জানান।