ব্যাংক সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দেশের বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল সুশাসনের কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিও প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের পাশাপাশি মুদ্রা, রাজস্ব ও বাণিজ্যনীতির সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

বুধবার ( ২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধিতে মুদ্রা, রাজস্ব ও বাণিজ্যনীতির সমন্বয়’ শীর্ষক বিশ্লেষণে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার এসব তথ্য তুলে ধরেছেন।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মূলধন অনুপাত নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি, ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও প্রভাবশালী গ্রাহকদের বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন নিশ্চিত ও দুর্বল ব্যাংকের সংস্কার জরুরি।

ব্যাংকের এই দুর্বলতার প্রভাব পড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগেও। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে কয়েক মাস বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে ছিল। অথচ ব্যাংক আমানত বেড়েছে ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ আমানত বাড়লেও সেই অর্থের যথেষ্ট অংশ নতুন ঋণ হিসেবে বিনিয়োগে যাচ্ছে না।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের অক্টোবরে নীতিসুদ বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করেছিল। পরে ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই তা কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে। তবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।

ড. জায়েদী সাত্তারের মতে, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়াও মূল্যস্ফীতির বড় কারণ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ও বাণিজ্যনীতির সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি কমানো এবং ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এসব সংস্কার কার্যকর হলে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।

সম্মেলনের সভাপতি ও বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, বিনিয়োগে স্থবিরতা, অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, সুশাসন, সম্পদের গুণগত মান ও জবাবদিহির দুর্বলতা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে।

তিনি বলেন, “ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো আস্থা। আস্থা না থাকলে সঞ্চয়কে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।”

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে করপোরেট সুশাসন জোরদার, সম্পদের গুণগত মান ও মূলধন পর্যাপ্ততা উন্নত করা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বাড়ানো এবং ব্যাংক পুনর্গঠন ও নিষ্পত্তি কার্যক্রম কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নিরাপদ ডিজিটাল আর্থিক সেবা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং টেকসই ব্যাংকিং নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

ব্যাংক খাত সংস্কার নিয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘ঋণখেলাপির সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার জন্য অনেক কষ্টে নানা নিয়মকানুন তৈরি করা হয়, সংস্কার করা হয়। পাশাপাশি বিধিবিধান বানিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলাম। কিছু বেসরকারি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু এরপর শুরু হয় ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি। কোনো নিয়মকানুন ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। এটা আরও মারাত্মক।’

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকার যদি রাজনৈতিক কারণে সুযোগ-সুবিধা বিতরণ করতেই চায়, তবে তারা এমন খাত বেছে নিক, যাতে দেশের অর্থনীতির বড় কোনো ক্ষতি না হয়। কিন্তু ব্যাংকিং খাত বা আর্থিক খাতের মাধ্যমে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করা একেবারেই অনুচিত। এটা রাজনৈতিক সরকারকেই বুঝতে হবে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা ব্যাংকারদের কিছু করার নেই।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহমেদ, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন।

দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে ১৩টি প্লেনারি অধিবেশনে ১০৪টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে। এতে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকার, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।