হৃদয়ে ইমানের মাধুর্য

মানুষের অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে সাধারণত দুটি ধরন দেখা যায়। এক ধরনের মানুষ সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও কল্যাণের মধ্যে জীবন কাটান। তারা নিজের প্রতি যেমন উদার, অন্যের প্রতিও তেমন উদার। তাদের হৃদয় কোমল, মন নির্মল এবং মুখমণ্ডল থাকে প্রফুল্ল।

আরেক ধরনের মানুষ নানা দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটান। তারা প্রায়ই অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং নানা বিষয়ে অভিযোগ করেন। এই অসন্তোষ তাদের জীবনের শান্তি ও নিরাপত্তা নষ্ট করে। তারা সুখ ও স্বস্তি হারিয়ে ফেলেন। মন থেকে বিদায় নেয় তৃপ্তি ও স্থিরতা। তাদের অন্তর ভরে ওঠে বিদ্বেষ, হিংসা ও স্বার্থপরতায়।

হে আল্লাহর বান্দারা! কী কারণে মানুষের মধ্যে এমন পার্থক্য তৈরি হয়? কোন বিষয়টি তাদের জীবন ও মানসিকতাকে দুদিকে পরিচালিত করে? এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইমান এবং ইমানের মাধুর্য।

আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন। ইমানের মাধুর্য হলো হৃদয়ের এমন এক অনুভূতি, যা সন্তুষ্ট আত্মায় বিরাজ করে। এটি হৃদয়ের এমন এক প্রশান্তি, যা শিরা-উপশিরায় রক্তের প্রবাহের মতো অন্তরে প্রবাহিত হয়। সেখানে অস্থিরতা নেই, উদ্বেগ নেই, সংকীর্ণতা নেই, অন্যকে সংকীর্ণ করে তোলার প্রবণতাও নেই। বরং সেখানে রয়েছে উদারতা, রহমত, সন্তুষ্টি ও নেয়ামতের অনুভূতি। এটি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। তিনি মহা অনুগ্রহের অধিকারী।

আল্লাহর প্রতি ইমান মানে আত্মার প্রশান্তি ও হৃদয়ের হেদায়েত। এটি সত্যের পথে চলা মানুষের আলোকবর্তিকা, হতাশ মানুষের আশা, ভীত মানুষের নিরাপত্তা এবং সংগ্রামরত মানুষের বিজয়ের প্রেরণা। এটি মুত্তাকিদের জন্য সুসংবাদ এবং বঞ্চিতদের জন্য বিশেষ দান। ইমান আশার উৎস, সাহসিকতার সহচর এবং প্রত্যাশার প্রশান্তি। এটি আত্মবিশ্বাস, জাতির মর্যাদা এবং জনগণের প্রাণশক্তি।

হে মুসলমানরা! ইমানের মাধুর্য লাভের এবং সুখ ও সন্তুষ্টির স্বাদ আস্বাদনের প্রথম পথ হলো আল্লাহকে রব হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করা। তিনি মহিমান্বিত ও বরকতময়। তিনি প্রত্যেক ব্যক্তির তত্ত্বাবধায়ক। তিনি দুনিয়া ও আখেরাতের পরম করুণাময়, উভয় জগতের অসীম দয়ালু। তিনি আসমান ও জমিনের চিরস্থায়ী ধারক ও নিয়ন্ত্রক। তিনি মৃত্যু, জীবন এবং সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্টা। তিনি অগণিত নেয়ামত দান করেন, বিপদগ্রস্তের আহ্বানে সাড়া দেন এবং দুঃখ-কষ্ট দূর করেন।

তিনি প্রত্যেক সৃষ্টিকে তার উপযোগী আকৃতি দিয়েছেন, তারপর তাকে পথনির্দেশ করেছেন। তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যে নিজের পক্ষ থেকে রুহ ফুঁকে করেছেন। তিনি ক্ষুধা নিবারণের জন্য আহার দিয়েছেন, সতর ঢাকার জন্য পোশাক দিয়েছেন, ভয় থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, পথভ্রষ্টতার পর হেদায়েত দিয়েছেন এবং অজ্ঞতার পর জ্ঞান দান করেছেন।

হে ভাইয়েরা! ইমানের মাধুর্য লাভের দ্বিতীয় পথ হলো ইসলামকে দ্বীন হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করা। ইসলাম আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ দ্বীন। তিনি তার রাসুলের ওপর তা নাজিল করেছেন এবং তার বান্দাদের জন্য তা পছন্দ করেছেন। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন তিনি গ্রহণ করবেন না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দ্বীন হলো ইসলাম।’ ( সুরা আলে ইমরান ১৯) অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অনুসন্ধান করবে, তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা আলে ইমরান ৮৫)

আল্লাহর দ্বীনের প্রতি সন্তুষ্টির এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত শুনুন। একবার ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) তার স্ত্রী আতিকা (রা.)-এর ওপর রাগান্বিত হয়ে বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে এমন কষ্ট দেব, যাতে তুমি দুঃখ পাবে।’ তখন তিনি বললেন, ‘আপনি কি আমাকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন, যে ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে হেদায়েত দিয়েছেন?’ ওমর (রা.) বললেন, ‘না।’ তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে আপনি আমাকে কীভাবে কষ্ট দেবেন?’

আল্লাহু আকবার! কী অসাধারণ আত্মবিশ্বাস, প্রশান্তি, সন্তুষ্টি ও স্থিরতা! যতক্ষণ তার দ্বীন অক্ষুণœ রয়েছে, ততক্ষণ তিনি নিশ্চিন্ত। তার ওপর যত বিপদই আসুক না কেন, দ্বীন অক্ষুণœ থাকলে তিনি বিচলিত নন। এমনকি তার ওপর বিপদাপদ একের পর এক নেমে এলেও তিনি ধৈর্য ধারণ করেন। আর আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করাও তার কাছে প্রিয়। সুতরাং ইসলাম সন্তুষ্টি ও আলোর উৎস। এটি সুখ, শান্তি ও সঠিক পথের দিশা। হে মুসলমানরা! ইমানের মাধুর্য লাভের তৃতীয় পথ হলো মুহাম্মদ (সা.)-কে রাসুল ও নবী হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করা। তিনি বিশ্বস্ত উপদেশদাতা, মানবজাতির জন্য প্রেরিত রহমত ও উত্তম আদর্শ। তার প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে তার নির্দেশের সঙ্গে কারও নির্দেশকে প্রতিদ্বন্দ্বী করা যাবে না। তার বিধানের ওপর অন্য কারও বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনার রবের কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্রে আপনাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। অতঃপর আপনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিজেদের মনে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং তা সম্পূর্ণরূপে মেনে নেয়।’ (সুরা নিসা ৬৫) মুহাম্মদ (সা.)-কে সন্তুষ্টচিত্তে রাসুল হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ হলো তার দেখানো পথে চলা, তার অনুসরণ করা এবং তার সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা।

হে আল্লাহর বান্দারা! যে ব্যক্তি ইমানের মাধুর্য আস্বাদন করে, তার জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে এবং সে নিজের পথ চিনতে পারে। যে নিজের পথ চিনতে পারে, সে অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে পথ চলে (অর্থাৎ বাহ্যিক রূপের চেয়ে ভেতরের সত্য, দূরদর্শিতা এবং আল্লাহর দেওয়া প্রজ্ঞা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া)। আর যে অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে পথ চলে, সে সন্তুষ্টির মাধ্যমে নিজের গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

ইমানের মাধুর্য মানুষের অন্তরকে আল্লাহর নির্ধারিত তকদিরের প্রতি সন্তুষ্টিতে পূর্ণ করে। জীবনে যা কিছু ঘটে, তার প্রতি অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি হয়। আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি মানুষের চিন্তা ও অনুভূতিতে স্থিরতা এনে দেয়। ফলে মুমিন তার পার্থিব জীবন নিয়ে নিশ্চিন্ত, সুখী ও প্রশান্ত থাকে। পরিস্থিতি যতই বদলে যাক, জীবনের অবস্থা যতই পরিবর্তিত হোক, তার অন্তরের প্রশান্তি নষ্ট হয় না।

যা হারিয়ে গেছে, তার জন্য সে হতাশ হয় না। আর যা অর্জন করেছে, তা নিয়ে অহংকারে উচ্ছ্বসিতও হয় না। জীবনের নানা পরিস্থিতি ও পরীক্ষা তার প্রশান্তিকে নষ্ট করতে পারে না, তার ধৈর্যকে টলিয়ে দিতে পারে না।

মুমিনের ব্যাপারটি বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, আর তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। সে বিপদে পড়লে ধৈর্য ধারণ করে, আর তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়। (সহিহ মুসলিম ২৯৯৯)

এমন গুণ কেবল দৃঢ় ইমানদারের মধ্যেই দেখা যায়। সুদৃঢ় ইমান মুমিনকে ভয়, কাপুরুষতা, অস্থিরতা ও অসন্তোষ থেকে মুক্ত করে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া আমাদের কিছুই ঘটবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর মুমিনদের উচিত আল্লাহর ওপরই ভরসা করা।’ (সুরা তওবা ৫১)

আমাদের রব যা দান করেছেন, তা কেউ আটকে রাখতে পারে না। আর তিনি যা আটকে রেখেছেন, তা কেউ দান করতে পারে না। কোনো সম্পদশালী বা মর্যাদাবান ব্যক্তির সম্পদ ও মর্যাদা আল্লাহর শাস্তি থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে না।

আল্লাহ সকলকে হেফাজত করুন। মুমিনকে যখন কিছু দেওয়া হয়, তখন সে তা গ্রহণ করে এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যখন কিছু থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সন্তুষ্ট থাকে ও ধৈর্য ধারণ করে। কোনো আদেশ পেলে দ্রুত তা পালন করে। নিষেধ করা হলে তা থেকে বিরত থাকে। আর কোনো পাপ করে ফেললে ক্ষমা প্রার্থনা করে।

হে মুসলমানর! যার ইমান দুর্বল, সে বিপদাপদে অস্থির হয়ে পড়ে। কারণ, সে জানে না কে তাকে পরীক্ষায় ফেলছেন। সে সফর করতে ভয় পায়, কারণ তার সঙ্গে কোনো পাথেয় নেই। সে পথ হারিয়ে ফেলে, কারণ তার কাছে কোনো পথপ্রদর্শক নেই।

আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে থাকা মানুষের জন্য কতই না দুর্ভোগ! মহান আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণ থেকে কঠোর হয়ে গেছে। তারা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে রয়েছে।’ (সুরা যুমার ২২)

যে ব্যক্তি ইমান হারিয়ে ফেলে, তার জীবন বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং তার সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। সে কোনো তত্ত্বাবধায়কের ভয় ছাড়াই কথা বলে ও কাজ করে। কোনো জবাবদিহির চিন্তা ছাড়াই চলাফেরা করে। তার জীবন স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার ছাপ বহন করে। নিজের প্রতি এবং অন্য মানুষের প্রতি তার আস্থা থাকে না।

২৩ অক্টোবর শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। ভাষান্তর করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান