ইউক্রেনে রুশ হামলাকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বলছে জাতিসংঘ

ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিকেন্দ্রসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে ইচ্ছাকৃত হামলা চালিয়ে রাশিয়া যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠন করছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন। গত সোমবার প্রকাশিত সংস্থাটির এক নতুন প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। খবর সিএনএন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিক থেকেই ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে রুশ বাহিনী। বিশেষ করে গত বছরের শীতের শুরুতে এসব হামলা মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে কোটি কোটি ইউক্রেনীয় নাগরিক নিজেদের অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকা ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।

জাতিসংঘের ‘ইনডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব ইনকোয়ারি অন ইউক্রেন’-এর তৈরি এই প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, হামলাগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে চালানো হয়েছে। সাধারণ জনগণকে মৌলিক জ্বালানি সরবরাহ থেকে বঞ্চিত করা এবং তাদের চরম দুর্ভোগে ফেলার বিষয়টিকে রাশিয়া একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রুশ কমান্ডাররা খুব ভালো করেই জানতেন যে, তারা যে তাপকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর নির্দেশ দিচ্ছেন, সেগুলো বিশেষ করে শীতকালে সাধারণ নাগরিকদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য ছিল।’

এ বিষয়ে সিএনএনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও ক্রেমলিনের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

তবে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘এই প্রতিবেদনটি ইউক্রেনীয়দের বহুদিনের অভিজ্ঞতারই সত্যতা নিশ্চিত করল। রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে লাখ লাখ মানুষকে বিদ্যুৎ, তাপ ও পানি থেকে বঞ্চিত করে শীত ও অন্ধকারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।’

অন্যদিকে, জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার স্থায়ী মিশন গত সোমবার এক বিবৃতিতে এই কমিশনের সব প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনটিকে একটি ‘রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট সংস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে রুশ প্রতিনিধিদল বলে, ‘জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংস্থা এবং তাদের গঠিত কোনো কমিশনকে রাশিয়া স্বীকার করে না। এই কমিশন কিইভে থাকা জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয়ের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা ভূয়া ও জাল তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করেছে।’ একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর অপরাধগুলো মানবাধিকার পরিষদের চোখে পড়ে না বলেও অভিযোগ তোলে মস্কো।

কিইভের তথ্য অনুযায়ী, গত শীতে রাশিয়ার ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে যায়। এর ওপর তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

প্রতিবেদনে ডিনিপ্রো শহরের এক নারী অধিবাসীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, "ঠান্ডা আপনাকে অসাড় করে ফেলে। উষ্ণ থাকার কোনো উপায় ছিল না এবং মাথার মধ্যে কেবলই আতঙ্কের চিন্তা আসত।" ঠান্ডা ও বিদ্যুৎহীন ঘরে চরম তাপমাত্রার কারণে হাসপাতাল ও বাসাবাড়িতে মানুষের মৃত্যুর প্রমাণও নথিবদ্ধ করেছেন চিকিৎসকরা।

পুতিন ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়ী করল জাতিসংঘ

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মূল দায়ী ব্যক্তি হিসেবে রাশিয়ার বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার একাধিক নির্দেশ ও বক্তব্য দিয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু, বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রে বেলোউসভ এবং সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ ভ্যালেরি গেরাসিমভ এসব হামলার পরিকল্পনা ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) আগেই পুতিন, শোইগু ও গেরাসিমভের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছে।

এদিকে শীত মৌসুম ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে রাশিয়া তাদের হামলা আরও জোরদার করেছে। গত সোমবার রাতেও কিইভের একটি বিশ্ববিদ্যালয়, মেট্রো স্টেশন ও আবাসিক এলাকায় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে এই হামলা চালানো হয়েছে, যার আশেপাশে কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। ইউক্রেন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে এসব হামলা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে এবং পশ্চিমা মিত্রদের কাছে জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছে।

মানবপাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রতিবেদনে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ পদ্ধতি নিয়েও মারাত্মক অভিযোগ আনা হয়েছে, যাকে জাতিসংঘের কমিশন 'মানবপাচার' এবং মানবধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।

কমিশনের দাবি, তারা অন্তত ২৯টি দেশ থেকে প্রলোভন, জালিয়াতি ও জোরজবর্দস্তির মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগের শক্ত প্রমাণ পেয়েছে। আফ্রিকা, ভারত ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের রাশিয়ায় ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এনে পরবর্তীতে জোরপূর্বক যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পাচারকারীরা তাদের পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেয় এবং বেতনের অর্থ নিজেরা আত্মসাৎ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বিদেশি সেনাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে জীবনের অধিকার ও মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকার থেকে চরমভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। অপরদিকে, ইউক্রেনের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া বিদেশি নাগরিকরা জেনে-বুঝে এবং নিজেদের ইচ্ছায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন বলে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে।