শৈশব মানবজীবনের এমন এক স্বর্ণালি অধ্যায়, যা সরলতা, অনাবিল আনন্দ এবং অকৃত্রিম বিশ্বাসে গড়া। প্রতিটি শিশুর জন্য একটি সুরক্ষিত, স্নেহময় ও ভয়হীন পরিবেশ নিশ্চিত করা যেকোনো সভ্য সমাজের প্রাথমিক ও মৌলিক দায়িত্ব। শিশু কেবল একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো জাতির অস্তিত্ব ও সম্ভাবনার বীজ ধারণ করে। কিন্তু আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় আজ শৈশবের সেই নির্মল চিত্রটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যে শিশুরা নিঃসংকোচে হাসবে, মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে খেলবে এবং নির্ভয়ে জ্ঞান অর্জন করবে, তারা আজ ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে, শিক্ষালয়ে এবং এমনকি পবিত্র হিসেবে বিবেচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও নজিরবিহীন যৌন সহিংসতা ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করলে যেকোনো সুস্থ মানুষের গা শিউরে ওঠে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বা এইচআরএসএস প্রতি মাসে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো পর্যবেক্ষণ করে যে মিডিয়া মনিটরিং বুলেটিন প্রকাশ করে, সেই ধারাবাহিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সাময়িক হ্রাস দেখা গেলেও ২০২৫ সাল এবং ২০২৬ সালের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এটি কেবল একটি আইনি সংকট নয়, বরং পুরো সমাজকাঠামোর ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
পরিসংখ্যানের আয়নায় তাকালে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। এইচআরএসএসের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ওই বছর পূর্ণ বছরে দেশে অন্তত ৪৭৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর সংস্থাটির চলতি বছরের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সংকলিত সর্বশেষ মাসিক পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসেই এই সংখ্যা ৩৯২ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ গত দুই বছরের কম সময়ে অন্তত ৮৬৬ জন শিশু যৌন নৃশংসতার শিকার হয়েছে।
এই ভয়াবহতার মাত্রা বোঝা যায় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর একটি বিশেষ অনুসন্ধানে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে সংঘটিত মোট ধর্ষণের ঘটনার অর্ধেকেরও বেশি, প্রায় ৫৬ শতাংশের শিকার হচ্ছে অবুঝ শিশুরা। কেবল ধর্ষণই নয়, যৌন হয়রানির পরিসংখ্যানও ঊর্ধ্বমুখী। এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যেখানে ২৩৬টি যৌন হয়রানির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত তা বেড়ে ২৭৬টিতে উন্নীত হয়েছে।
শারীরিক নিগ্রহ ও হত্যার চিত্র আরও মারাত্মক। সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, নির্যাতনের ফলে শিশু হত্যার ঘটনা ২০২৫ সালে ছিল ২৮৮টি, যা ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪৯৪টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গত দুই বছরে নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছে ৭৮২ জন শিশু। এর পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনে গুরুতরভাবে আহত হয়েছে আড়াই হাজারেরও বেশি শিশু। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো ধর্ষণের পর প্রমাণ লোপাটের জন্য হত্যা। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন একত্র করে এইচআরএসএস জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে দেশে অন্তত ১৩১ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। বছর শেষ হওয়ার আগেই ২০২৬ সালের এই পরিসংখ্যানের বিস্ফোরণ স্পষ্ট করে দেয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও শিশুদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর কোনো প্রতিরক্ষা বলয় এখনো তৈরি হয়নি।
শিশুর ওপর এই সহিংসতার ধরন ও স্থান বিশ্লেষণ করলে এক গভীর কাঠামোগত ব্যাধি উন্মোচিত হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, শিশু যৌন নির্যাতনের ৮০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে অপরাধী কোনো অচেনা ব্যক্তি নয়। তারা ভুক্তভোগী শিশুর অতি পরিচিত আত্মীয়, প্রতিবেশী, পারিবারিক পরিচিত ব্যক্তি কিংবা শিক্ষক। এই চক্র বুঝতে অপরাধ মনস্তত্ত্বের গ্রুমিং প্রসেস থিওরি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অপরাধী হঠাৎ আক্রমণ করে না। সে প্রথমে কৌশলে শিশু ও তার পরিবারের আস্থা অর্জন করে। অতিরিক্ত স্নেহ, উপহার বা প্রশংসার মধ্য দিয়ে সে শিশুটিকে একটি মানসিক জালে বন্দি করে ফেলে, যাকে মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় গ্রুমিং বলা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণমাধ্যমে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে আবাসিক মাদ্রাসা, হেফজখানা ও এতিমখানার মতো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদী নির্যাতনের ধারাবাহিক চিত্র। যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অভিভাবকরা আস্থা ও নৈতিকতা শেখার নিরাপদ আশ্রয় মনে করে সন্তানকে দেন, সেখানেও অনেক ক্ষেত্রে অন্ধকার পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আবাসিক পরিবেশে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে শিশুদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির একমুখী প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হয়। সমাজবিজ্ঞানী আর্ভিং গফম্যানের টোটাল ইনস্টিটিউশন থিওরি এক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে প্রযোজ্য। তাঁর মতে, যখন কোনো শিশু সমাজ ও পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে চার দেয়ালের ভেতরে ২৪ ঘণ্টা একই কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকে, তখন সেখানে চরম ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। এই অবরুদ্ধতার সুযোগ নিয়ে কিছু বিকৃত মানসিকতার শিক্ষক শিশুদের ওপর তাদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বিস্তার করে।
এই নিপীড়নের সাথে যুক্ত হয় ধর্মীয় ভীতি ও সুপরিকল্পিত ম্যানিপুলেশন। অনেক ক্ষেত্রে ওস্তাদের অবাধ্যতা করা পাপ, জাহান্নামের শাস্তি বা ওস্তাদের অভিশাপ-এর মতো বাক্য ব্যবহার করে শিশুদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর সাথে মনোবিজ্ঞানে যাকে স্পিরিচুয়াল ম্যানিপুলেশন ও ট্রমা বন্ডিং বলা হয়, সেই প্রক্রিয়া কাজ করে। অনবরত ভয় ও আঘাতের পাশাপাশি মাঝে মাঝে সামান্য স্নেহের ভান দেখিয়ে অপরাধী তার শিকার শিশুর মনে এক বাধ্যতামূলক আত্মসমর্পণের মানসিকতা গড়ে তোলে। ফলে নির্যাতিত শিশু চরম যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেলেও মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস পায় না।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, যখন এসব ঘটনা সামনে আসে, তখন বিচার প্রক্রিয়া শুরুর বদলে দেখা যায় ইনস্টিটিউশনাল বেট্রেয়াল বা প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসভঙ্গের চিত্র। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের কথিত সম্মান, ধর্মের ভাবমূর্তি রক্ষা কিংবা লোকলজ্জার দোহাই দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অপরাধীকে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার বদলে সমঝোতার মাধ্যমে বা চুপিসারে অন্য কোনো মাদ্রাসায় বদলি করে দেওয়া হয়, আর ভুক্তভোগী শিশুটিকেই হেনস্তা করে বের করে দেওয়া হয়। ক্ষমতার প্রভাব এবং অপকৌশলে ধর্মীয় পোশাক ও অনুশাসনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার এই অনৈতিক প্রবণতা অনিয়ন্ত্রিত অপরাধের এক অভয়ারণ্য তৈরি করেছে।
বিচার প্রক্রিয়ায় নীরবতার পেছনে কাজ করে মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যানের লার্নড হেল্পলেসনেস বা অর্জিত অসহায়ত্বের তত্ত্ব। যখন একটি শিশু বা তার পরিবার দেখে যে প্রতিবাদ করেও বিচার পাওয়া যায় না, বরং ভুক্তভোগীকেই একঘরে হতে হয়, তখন তারা ধরে নেয় পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। একই সাথে সমাজে প্রবলভাবে বিদ্যমান ভিকটিম ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার প্রবৃত্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। মনস্তত্ত্বের জাস্ট-ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে, মানুষ নিজেকে স্বস্তি দিতে ভাবে যে খারাপ ঘটনা কেবল খারাপ মানুষের সাথেই ঘটে। ফলে কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে সমাজের একাংশ অপরাধীর শাস্তি না চেয়ে উল্টো শিশুটির চলাফেরা বা পরিবারের লালন-পালন নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
অপরাধবিজ্ঞানের রেশনাল চয়েস থিওরি দিয়ে এই বিচারহীনতাকে ব্যাখ্যা করা যায়। এই তত্ত্ব বলে, যখন অপরাধের শাস্তি পাওয়ার ঝুঁকি কম এবং পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, তখন অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। আমাদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও মামলার বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের গাফিলতি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে শাস্তির হার হতাশাজনক।
শিশुओं সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই বিষাক্ত বলয় থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং স্কুলে সরকারি ও স্বাধীন তদারকি জোরদার করতে হবে। গোপন বা অন্ধকার কক্ষের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে প্রতিটি প্রাঙ্গণকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে। আলেম-ওলামা, শিশু মনোবিজ্ঞানী, সমাজসেবক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদারকি সেলের মাধ্যমে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবারকে সচেতন হতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের নিজ শরীরের ব্যক্তিগত সীমানা, নিরাপদ স্পর্শ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। তৃতীয়ত, অপরাধীকে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে সমপরিমাণ অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এর পাশাপাশি নির্যাতিত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সরকারি পর্যায়ে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
যে সমাজে একটি শিশু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না, তার সুস্থ বিকাশ নিয়ে খেলা করা হয়, সেই সমাজের কোনো উন্নয়নই স্থায়ী হতে পারে না। ধর্মীয় শিক্ষার প্রাঙ্গণ হোক কিংবা সাধারণ বিদ্যালয়, গৃহ হোক কিংবা খেলার মাঠ— শিশুর জন্য স্থানটি নিরাপদ করাই সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ভীতি, অন্ধত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বা লোকলজ্জার দেয়াল ভেঙে শিশুদের অভয়ারণ্য তৈরি করতে আমাদের এখনই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ আজকের নিষ্পাপ শিশুমুখের হাসি রক্ষা করতে না পারলে, এক নিঃশ্বাসে ধ্বংস হয়ে যাবে আগামী দিনের বাংলাদেশ।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক