চট্টগ্রাম বোর্ড : নক্ষত্রের পথে শোভন

চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের ফলাফল জালিয়াতির ঘটনায় মামলা হয়েছে। বাংলা প্রথমপত্র ছাড়া সব বিষয়ে ফেল করলেও গত ১০ আগস্ট এসএসসি পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে ৪ দশমিক ৯৪ জিপিএ পেয়েছিল শিক্ষার্থী হাসিবুল আলী শোভন। পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনে তা শনাক্ত হওয়ার পর বোর্ডের তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে গতকাল বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করেন চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন। মামলায় চারজনকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ‘চট্টগ্রাম বোর্ডে আবারও ফলাফল জালিয়াতি!’ শীর্ষক প্রতিবেদন দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত হয়েছিল।

মামলার প্রসঙ্গে বোর্ড সচিব প্রফেসর জহিরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক আগেই তদন্ত শেষ করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষজ্ঞ টিমও এই ঘটনা নিয়ে কাজ করে। সবার সম্মিলিত অনুসন্ধান ও তদন্তে আমরা নিশ্চিত হয়েছি দুটি কম্পিউটারে তিনজনের মাধ্যমে ফলাফল অনিয়মের কাজ করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন ছিলেন স্ক্যানার ও আরেকজন স্ক্যানের পর ভুলত্রুটি শুদ্ধ করেন। অনিয়মের সুফলভোগী শিক্ষার্থীকেও আসামি করা হয়েছে।’

মামলার বিষয়ে পাঁচলাইশ থানার ওসি মোজাম্মেল হক বলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল জালিয়াতির একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থী হাসিবুল আলী শোভন এবং শিক্ষাবোর্ডের তিন কর্মচারী ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী, রাশেদুল ইসলাম ও নূর হোসেন রায়হানকে আসামি করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

এর আগে একই বিষয়ে মামলা হয়েছিল বোর্ডের সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে। তার ছেলের ফলাফল জালিয়াতির ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন শিক্ষাবোর্ডের তৎকালীন সচিব প্রফেসর সামসুদ্দিন আজাদ। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। তিনি ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ১১টি পত্রের নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

মামলায় আসামি হওয়ার বিষয়ে জানতে কথা হয় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা আবে শাহেদ হারুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের ফলাফল পরিবর্তনের জন্য তো আমরা কাউকে বলিনি। কারা কেন পরিবর্তন করেছে তাও আমরা জানি না। এ বছর আমার ছেলে কোনো কলেজে ভর্তিও হতে পারেনি।’

অভিযুক্ত শিক্ষার্থী সম্পর্কে জানা যায়, আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল হাসিবুল আলী শোভন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ৪.৯৪ পেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সে বাংলা প্রথমপত্র ছাড়া সব বিষয়ে ফেল করেছে। এমনকি নৈর্ব্যক্তিক ছাড়া সব বিষয়ের সৃজনশীল নম্বর পরিবর্তনও করা হয়েছিল। শোভন প্রসঙ্গে তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ গোলাম ফরহাদ বলেন, শিক্ষার্থী নির্বাচনী পরীক্ষায়ও সব বিষয়ে খারাপ করেছিল। তারপরও সবাইকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছিলাম।

যেভাবে শনাক্ত হয়েছিল অনিয়ম : পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ আগস্ট একজন পরীক্ষক পদার্থ বিজ্ঞানের একটি উত্তরপত্রে প্রিন্ট আউটের (প্রকাশিত ফলাফল) নম্বরের সঙ্গে খাতার প্রাপ্ত নম্বরের অমিল দেখতে পান। খাতায় শূন্য থাকলেও প্রিন্ট আউটে ৪৫ ছিল। এই অসংগতি চেক করার জন্য চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী তখন উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল মন্নানকে চেক করতে বলেন। সেখানেও কম্পিউটার সেন্টারের ডাটার সঙ্গে খাতার নম্বরের অমিল পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে আবদুল মন্নান ও উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (উচ্চ মাধ্যমিক) প্রফেসর মোহাম্মদ দিদারুল আলমকে সঙ্গে নিয়ে বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীকে লিখিতভাবে অবগত করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তখনই এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন চেয়ারম্যান। ২৫ আগস্ট শিক্ষাবোর্ডের উপ-সচিব স্বাক্ষরিত আদেশে বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতেই গতকাল মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জহিরুল হক স্বপন জানান।

অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ফলাফল বাতিল হবে : শিক্ষার্থী শোভনের ফলাফল বাতিল করা হবে জানিয়ে বোর্ডের সচিব প্রফেসর জহিরুল হক স্বপন বলেন, ‘ইতিমধ্যে সার্ভার থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন তার ফলাফল বাতিলের বিষয়টি শৃঙ্খলা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ফলাফল নিয়ে শিক্ষাবোর্ডের যত অনিয়ম

এদিকে গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের পুনর্নিরীক্ষণের সময় ৩৪টি খাতার নম্বরপত্র বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন যেটা ঘটেছিল সেটা হলো পুনর্নিরীক্ষণের সময় নিরীক্ষণ শেষে খাতায় প্রাপ্ত নম্বর লিখেছিলেন পুননির্রীক্ষণের পরীক্ষক। কিন্তু নিরীক্ষণের ফলাফল শিটে ৩৪টি উত্তরপত্রে বাড়তি নম্বর ইনপুট দেওয়া হয়েছিল। পরে তা শনাক্ত করে সঠিক প্রাপ্ত নম্বর বসিয়ে নিরীক্ষণের চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত করেছিল পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর। এর আগে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফলাফলে ১১টি পত্রের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে মামলাও হয় এবং মামলায় চার্জশিটও দাখিল হয় এবং এখন মামলার শুনানি চলছে। 

সব জালিয়াতি কম্পিউটার সেন্টারে

ফলাফল নিয়ে যত জালিয়াতির ঘটনা সবই হচ্ছে কিন্তু কম্পিউটার সেন্টারে। বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রধান পরীক্ষক থেকে প্রাপ্ত নম্বরগুলোকে বলা হয় ‘এইচ’ টাইপ। আর পরীক্ষার হল থেকে উত্তরপত্রের প্রথম অংশ কম্পিউটার সেন্টারে আগেই চলে যায়, সেটাকে বলা হয় ‘ই’ টাইপ। ই-টাইপ আগেই সার্ভারে স্ক্যান করে ঢুকিয়ে রাখা হয়। প্রধান পরীক্ষক থেকে নম্বর আসার পর এইচ-টাইপ স্ক্যান করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলাফল প্রকাশের কয়েকদিন আগে একটি প্রোগ্রামিং (ডি কোডিং) করা হয়। আর তা করা হলে লিথু কোডের মাধ্যমে ই-টাইপ তার নিচের অংশের এইচ-টাইপকে খুঁজে নেয়। আর তখনই জানা যায় কোন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল। শিক্ষার্থীর পরিচয় জানতে পারার পর কম্পিউটার সেন্টারের কেউ হয়তো কোনো শিক্ষার্থীর নম্বর বাড়িয়ে দেয়। সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ঘটনায় সেভাবেই ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছিল। আদালতে দাখিলকৃত চার্জশিটেও তা উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন পাস করে। এদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯ হাজারর ৩৯৮ জন। ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছে ৩৯ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী। পুনর্নিরীক্ষণে এসএসসিতে প্রকাশিত ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে নতুনভাবে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৮৩ জন, ফেল থেকে পাস করেছে ১৯০ জন।