খুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরদার অভিযান, রেকর্ড-সংখ্যক মামলা ও গণগ্রেপ্তারের পরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না অপরাধ প্রবণতা। খুন, অপহরণ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক কারবারসহ বিভিন্ন সহিংস অপরাধের ঘটনা বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দফায় দফায় পুলিশি অভিযান চালানোর পরও খুলনায় অপরাধের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। যা সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুয়ায়ী, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) এলাকায় গত ১০ মাসে অপরাধমূলক কর্মকান্ডের বিপরীতে রেকর্ড এক হাজার ২৮০টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় দুই হাজার ১৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মহানগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় মাদক ও ছিনতাইয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। অপরদিকে খুলনা জেলা পুলিশের আওতাধীন ৯টি উপজেলায় গত ৭ মাসে মোট ৭৬৬টি অপরাধের মামলা রুজু হয়েছে। এসব মামলায় এ পর্যন্ত এক হাজার ২৫৫ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ। জেলা পর্যায়ে গ্রামীণ কোন্দল, জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ এবং মাদক চোরাচালানের জেরে এসব মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ সূত্র জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলা মিলিয়ে মোট ৭১টি হত্যাকান্ড ঘটেছে। এর মধ্যে কেএমপি এলাকায় ৩৫টি এবং জেলা পুলিশের অধীনে ৩৫টি হত্যা মামলা রুজু হয়েছে। মহানগরে গত সেপ্টেম্বরে ৬টিসহ শেষ ৩ মাসে ১৫টি হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে, এর মধ্যে ২৯টির কারণ উদঘাটিত হয়েছে।
খুলনা মহানগরীতে গত ১০ মাসে মাদকের মামলা হয়েছে ৫১২টি, জেলায় মামলা হয়েছে ৩৫১টি; এ সময়ে মহানগরীতে ৫০টি অস্ত্র উদ্ধার, ২৩৩ রাউন্ড গুলি ও ৮৫টি কার্তুজ উদ্ধার করা জয়েছে। অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে ৫০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং এসব মামলায় ৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুলান জেলায় গত ৭ মাসে ৩১টি অস্ত্র উদ্ধার ও ৭১ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে গত ১০ মাসে খুলনা অঞ্চলের অন্তত ৬০ জন তালিকাভুক্ত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে। এর মধ্যে মহানগরে ৩৬ জন ও জেলায় ২৪ জন রয়েছে। সর্বশেষ অক্টোবরে ৯ দিনের এক বিশেষ অভিযানে খুলনা জেলা পুলিশ ২৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করে এবং বেশ কিছু মাদক ও ট্রাফিক মামলা নথিভুক্ত করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, ছিনতাই ও মাদকের সহজলভ্যতার কারণেই মূলত অপরাধের এই লাগামহীন বিস্তার। পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে বিপুলসংখ্যক অপরাধী গ্রেপ্তারের পরেও সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরছে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, অপরাধ দমনে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিটি অপরাধের ঘটনাতেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলে, খুলনার অধিকাংশ হত্যাকান্ড সংঘটিত হচ্ছে মাদক কারবারিদের মধ্যে বিরোধের জের ধরে। অপরাধীরা মোটরসাইকেলে করে এসে অপরাধ সংঘটিত করে সহজে পালিয়ে যাচ্ছে। মোটরসাইকেলগুলো রেজিস্ট্রিকরণের আওতায় আনতে পারলে অপরাধ প্রবণতা অনেক কমে যেত।
কেমএপি কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, খুলনায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করতে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের একাধিক টিম ইতিমধ্যে অভিযান শুরু করেছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগী গ্রেপ্তার হচ্ছে। নগরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। অচিরেই খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।