বইচিত্র

দিনলিপির আলোয় কবির ভুবন

কবি যখন গদ্য লেখেন, তখন সেই গদ্যে কবিতার মেজাজটুকু রয়েই যায়। কবি আলতাফ হোসেন বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র কণ্ঠের অধিকারী; একই সঙ্গে গদ্যেও তিনি সমান পারদর্শী। সদ্য প্রকাশিত তার কবির জার্নাল বইটি পড়লে যেন সেই সত্যেরই প্রমাণ পাই আমরা।

বইটিতে সংকলিত হয়েছে চল্লিশটিরও বেশি গদ্যরচনা। সাহিত্যপাঠের গভীরতা থেকে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার টানাপড়েন, সবই এখানে ধরা দিয়েছে এক সংবেদী মনের দৃষ্টিতে। কখনো স্মৃতির অলিগলি, কখনো দেশ-বিদেশের শিল্প-সংস্কৃতি, কখনো ব্যক্তিগত পাঠ ও অনুভবের সূত্র ধরে লেখাগুলো পাঠককে নিয়ে যায় নতুন ভাবনার দিকে।

বইয়ের সবচেয়ে পুরনো লেখাটি ১৯৬৭ সালের আর সাম্প্রতিকতম রচনাটি ২০১৯-এর। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে লেখাগুলো এক কবির মনোজগতের বদলে যাওয়ার সাক্ষী হয়ে আছে।

বইয়ের প্রসঙ্গত অংশে মুহিত হাসান বলেছেন, আলতাফ হোসেনের গদ্য ‘ব্যতিক্রমী, তাই বিশিষ্ট।’ কিছু লেখা খণ্ডিত আকারে ছাপতে হয়েছে, তবু পাঠক পড়তে গিয়ে হোঁচট খাবেন না বলেই তিনি আশ্বস্ত করেছেন।

বইয়ের সূচিপত্রই এর বৈচিত্র্যের জানান দেয়। ইউজিন ইউনেস্কোর সঙ্গে সাক্ষাৎকার থেকে সা’দাত হাসান মান্টো, শ্রীলংকা ভ্রমণ থেকে সত্যজিতের ‘সিকিম’, সবই এসেছে সহজ ভঙ্গিতে।

শুরুর লেখাটি রবীন্দ্রনাথের গানের কথা নিয়ে। লেখক সরাসরি স্বীকার করেন, ‘অতিলৌকিক অনুভবদের বাহন নেই।’ তবু সেই অধরা অনুভবকে তিনি ছুঁতে চান গানের কথার ভেতর দিয়ে, পাঠের আনন্দ আর অনুভবের সততা সঙ্গে নিয়ে। প্রথম অংশের শেষে তিনি টেনে আনেন সেই চেনা চরণ, ‘মানুষের মন চায় মানুষেরি মন।’ এখানে ব্যাখ্যার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে একজন পাঠকের আন্তরিক অনুভব।

কবির জীবন আর কবিতা কতটা আলাদা, এই প্রশ্ন উঠে এসেছে অডেনের প্রসঙ্গে। অডেন মনে করতেন, প্রকৃত শিল্পী চান না তার জীবনী লেখা হোক। লেখক তার কিছু কথাকে অত্যন্ত সত্য মনে করেন, আবার কিছু কথায় তার মনে প্রশ্নও জাগে। তিনি জানতে চান, ‘ভালোবাসার অভিজ্ঞতা’ ছাড়া কি ভালোবাসার গভীর কবিতা সম্ভব? কিন্তু নিজের মত চাপিয়ে না দিয়ে শেষে বিনয়ের সঙ্গে নিজেকে বলেন ‘অত্যন্ত সাধারণ পাঠক।’ এই বিনয়ই তার গদ্যকে দিয়েছে আলাদা স্বচ্ছতা।

নব্বইয়ের দশকের দিনলিপিগুলোতে লেখক আরও ঘরোয়া, আরও খোলামেলা। সিলভিয়া প্লাথকে নিয়ে তিনি লেখেন, ‘ভালোবাসতাম খুব সিলভিয়া প্লাথকে।’ পড়তে পড়তে টের পাওয়া যায়, বই আর লেখা তার জীবনের সঙ্গে কতটা জড়িয়ে আছে। আবার নিজেকে নিয়েই কৌতুক করে জানান, দিনলিপি বলেই ‘আমি আমি’ এসে যাচ্ছে। এই স্বচ্ছতাই যেন লেখাগুলোকে আরও আপন করে তোলে।

বইয়ের শেষ দিকে আছে শহীদুল জহিরের কথা। তিনি লেখকের দুটি কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন, সেই স্মৃতিচারণের সঙ্গে সাজানো হয়েছে ‘এমন ভঙ্গিতে বলো’ কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি :
বরং বাওবাব গাছের কথা ফিরে বলো আবার
দশ বছর আগে বলেছিলে
এমন ভঙ্গিতে বলো

চরণ কয়টিতে সময় আর স্মৃতির প্রতি কবির টান স্পষ্ট। একজন বড় লেখকের মনোযোগ পাওয়াকে তিনি ‘সৌভাগ্য’ বলেই মনে করেন, আর সেই কৃতজ্ঞতাও লেখাটিকে করে তোলে মহিমান্বিত।

এক কথায় বলা যায়, কবির জার্নাল কেবল প্রবন্ধ বা শুধু স্মৃতির সংকলন নয়। এ একজন কবির পাঠ, ভাবনা আর বেঁচে থাকার জীবন্ত দলিল। যারা কবিতার ভেতরের মানুষটিকে চিনতে চান, বইটি তাদের জন্য সুখপাঠ্য হবে।