নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নেমেই দুশ্চিন্তায় হাজারো জেলে

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছ ধরতে নেমে আশানুরূপ ইলিশ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন পিরোজপুরের কয়েক হাজার জেলে। জেলার কঁচা, সন্ধ্যা, বলেশ্বর ও কালীগঙ্গা নদীতে প্রত্যাশিত মাছ না মেলায় পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। মাছ না পাওয়ার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তার চাল কম পাওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন জেলে। তবে জেলা মৎস্য বিভাগ বলছে, বরাদ্দ অনুযায়ী প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের উমেদপুর গ্রামের জেলেপল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে নদী থেকে মাছ ধরে ফিরছেন জেলেরা। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে মাছ ধরতে নামলেও কারও জালে মিলেছে দু-একটি ইলিশ, আবার কেউ পেয়েছেন সামান্য পোয়া মাছ। অনেক জেলে জানিয়েছেন, মাছ বিক্রি করে নৌকার জ্বালানি তেলের খরচও তুলতে পারেননি তারা।

পাড়েরহাট এলাকার জেলে সুমন সিকদার (৪০) বলেন, দীর্ঘ ২২ দিন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা পালন করেছেন তারা। এ সময় মাত্র ২০ কেজি চাল পেয়েছেন। পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে ওই চাল দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শেষে বৃহস্পতিবার রাতে মাছ ধরতে গিয়ে মাত্র ৩০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ পেয়েছেন তিনি।

pirojpur

একই এলাকার জেলে রফিক শেখ (৪৫) জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর নদীতে মাছ না পাওয়ায় তার দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।

কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠি গ্রামের জেলে সুবল দত্ত (৪০) বলেন, অনেক আশা নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে গেলেও জ্বালানি তেলের খরচ ওঠেনি। সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালিয়েছেন। এখন সেই ঋণের কিস্তি কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন।

পিরোজপুর অষ্টম চীন মৈত্রী সেতু সংলগ্ন খুচরা মৎস্য ব্যবসায়ী আরমান মোল্লা (৫৩) জানান, গত ২২ দিন নদী ও সাগরের মাছ বিক্রি করতে পারেননি তারা। শুক্রবার সকালে সামান্য কিছু মাছ এসেছে। জেলেদের কাছ থেকে জানা যাচ্ছে, নদীতে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। মাছ লোনা পানির দিকে চলে গেছে বলে তাদের ধারণা। মাছ কিনতে এসে ক্রেতারাও হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। পরিবার নিয়ে টিকে থাকতে ব্যবসা পরিবর্তনের কথাও ভাবতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এদিকে নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তার চাল বিতরণ নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন জেলেরা। তাদের দাবি, জনপ্রতি ২৫ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ পেয়েছেন ১৮ কেজি, কেউ ১৯ থেকে ২২ কেজি। পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি হওয়ায় এই চাল দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

পাড়েরহাট এলাকার জেলে হাবিব শিকদার (৭০) বলেন, তারা ২২ কেজি চাল পেয়েছেন। উপজেলা থেকে চাল আনতে খরচ হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের জানিয়েছেন। এ কারণে ২২ কেজি চাল দেওয়ায় তারা সন্তুষ্ট বলে জানান তিনি।

pirojpur 3

একই এলাকার মুরাদ খান (৪২) বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চাল এনে ওজন করে দেখেছেন ২০ কেজি। ২৫ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২০ কেজি পেয়েছেন। এই চাল দিয়ে ছয় সদস্যের পরিবার কীভাবে চলেছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে নদীতে মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারকে দায়ী করছেন জেলেদের কেউ কেউ। পিরোজপুর সদর উপজেলার চিথলিয়া এলাকার জেলে সালাম মৃধা (৫৮) বলেন, খাল ও নদীতে নেট বা জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে ছোট মাছও আটকা পড়ছে। এতে মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, পাশাপাশি মাছের সংখ্যাও কমছে। এসব জালের ব্যবহার বন্ধ করা গেলে খাল ও নদীতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রাপ্যতা বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার পর জেলার ২০ হাজার ৯৪৫ জন জেলেকে জনপ্রতি ২৫ কেজি করে মোট ৫০৩ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে।

নদীতে মাছ না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ইলিশ দ্রুতগতির সামুদ্রিক মাছ। নিষেধাজ্ঞা শেষে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী থেকে ইলিশ উজানের দিকে চলে যাচ্ছে। তবে কিছুদিন পর জেলেরা আশানুরূপ মাছ পেতে পারেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে নদীতে মাছের প্রাপ্যতা বাড়াতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, সরকারি সহায়তা সঠিকভাবে বিতরণ এবং জেলেদের জন্য সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।