'বাংলাদেশ সহজে হেরে যাওয়ার দল নয়'

একসময় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট মানেই ছিল স্পিননির্ভরতা। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে দলের খেলার ধরন, বেড়েছে পেস বোলিংয়ের শক্তি ও ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয় সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই বিবর্তন, নতুন পেসারদের সম্ভাবনা, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার স্বপ্ন এবং ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে তরিকুল ইসলাম সঙ্গে কথা বলেছেন শ্রীলঙ্কার সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমান ধারাভাষ্যকার রাসেল আর্নল্ড

রাসেল আরনল্ড

ধারাভাষ্য কক্ষে বসে নিয়মিত বাংলাদেশ দলের খেলা দেখেন। আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান টেস্ট দলের পারফরম্যান্সকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রাসেল আর্নল্ড : বাংলাদেশের খেলা দেখা আমার জন্য খুবই রোমাঞ্চকর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দলটি এখন ভিন্ন ধরনের ক্রিকেট খেলছে। অতীতে বাংলাদেশের খেলা মূলত স্পিন, বিশেষ করে বাঁহাতি স্পিননির্ভর ছিল। ঘরের মাঠে এই কৌশল বেশ কার্যকরও ছিল। তবে এখন বিশ্বজুড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তারা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। সে অনুযায়ী কাজও করছে, যার ফলাফল সবাই দেখছে। অস্ট্রেলিয়ায় জয় দলটিকে বড় ধরনের আত্মবিশ্বাস জোগাবে। বাংলাদেশের জন্য যেসব উইকেট তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো মূলত পেস বোলিংয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। তবে পেসের মুখোমুখি হয়েও রান করা এবং ব্যাটিংয়ে দারুণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়টি সত্যিই প্রশংসনীয়।

তার মানে বলতে চাচ্ছেন, বাংলাদেশ এখন টেস্টে পরিপূর্ণ একটি শক্তিশালী দল?
রাসেল : সেটা বলতে পারেন। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কৌশল ও মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে, উন্নতিও ঘটেছে। এখন আর কোনো দল বাংলাদেশকে হালকাভাবে নেয় না। ফাস্ট বোলার ও স্পিনারদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ এখন একটি পরিপূর্ণ দল। দলের মধ্যে দারুণ আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। খেলোয়াড়েরা নিজেদের দক্ষতারও উন্নতি করছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। বাংলাদেশ এমন কোনো দল নয়, যাদের সহজেই হারিয়ে দেওয়া যাবে। বরং তারা নিজেদের জন্য সম্মান অর্জন করেছে। তাদের হারানো কিংবা তাদের বিপক্ষে টিকে থাকা এখন বেশ কঠিন।

বাংলাদেশের এই টেস্ট দল আগামী দিনে কতটা সাফল্য পেতে পারে বলে মনে করেন?
রাসেল : অধিকাংশ এশীয় দলেরই অস্ট্রেলিয়ায় জয়ের অভিজ্ঞতা নেই। অথচ বাংলাদেশ খুব দ্রুতই সেই সাফল্য পেয়েছে। আমি ম্যাচটি দেখেছি। আন্ডারডগ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে খেলা উপমহাদেশের দলগুলোর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সেখানকার আগ্রাসী ক্রিকেট, কন্ডিশন, পেস ও বাউন্স সামলানো সহজ নয়। ডারউইনে বাংলাদেশ যা করেছে, তা সত্যিই অসাধারণ। আশা করি, এই সাফল্যকে ভিত্তি করে দলটি সামনে এগিয়ে যাবে। এমন জয় যদি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকে, তাহলে মানুষ একসময় তা ভুলে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি নিজেদের দক্ষতা, মাঠে পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন, মানসিকতা ও খেলার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখতে পারে, তাহলে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।

এবারের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে বাংলাদেশের ফাইনালে খেলার সম্ভাবনা কতটা দেখেন?
রাসেল : অবশ্যই সেই সম্ভাবনা রয়েছে। কয়েকটি জয়ই বাংলাদেশকে ফাইনালে পৌঁছে দিতে পারে। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভর করছে। দলের ভবিষ্যৎ ও এগিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা এখন তাদের হাতেই।

নাহিদ রানা, হাসান মাহমুদসহ বাংলাদেশ দলে বেশ কয়েকজন ভালো মানের পেসার উঠে এসেছেন। তাদের বোলিং নিশ্চয়ই দেখেছেন?
রাসেল : তাদের বোলিং দেখেছি এবং উন্নতিও লক্ষ্য করেছি। এ জন্য পুরো কৃতিত্ব খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রাপ্য। আমি আগেই বলেছি, বিশ্বমানের পেসারদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হয়। বাংলাদেশ সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে এবং এর সুফলও পাচ্ছে। চোট কাটিয়ে হাসান মাহমুদ এখন এমন একজন বোলার হয়ে উঠেছে, যাকে সবাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। অন্যদিকে, নাহিদ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বোলার। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারে, এমন বোলার সচরাচর পাওয়া যায় না। এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ফিটনেস ধরে রাখা এবং নিয়মিত মাঠে থাকা।

এর বাইরে বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারকে আপনার কাছে  সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে? 
রাসেল : বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্যে সাদমান ইসলাম দারুণ ব্যাটিং করছে। আশা করি, সে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে। তানজিদ হাসান তামিম যেভাবে নিজের খেলার ধরন ও অ্যাপ্রোচ ঠিক করছে, সেটিও আমার ভালো লেগেছে। এ ধরনের খেলোয়াড়েরাই ভবিষ্যতে অসাধারণ কিছু করে দেখাতে পারে।

আবারও উইকেটের প্রসঙ্গে আসি। ঘরের মাঠে স্পিনের সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করেন। এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
রাসেল : স্পিনবান্ধব কন্ডিশনে খেলার মধ্যে আমি কোনো ভুল দেখি না। কারণ, সেটি আপনার নিজের কন্ডিশন। আবহাওয়া, মাটি ও জীবনযাত্রাসহ অনেক বিষয়ই এর পেছনে প্রভাব ফেলে। অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের মতো বাউন্স কিংবা পিচের বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশে পাওয়া কঠিন। আর এতে কোনো সমস্যাও নেই। স্পিন ক্রিকেটেরই একটি অংশ। এই ধরনের কন্ডিশনে খেলতে ভিন্ন দক্ষতা ও মানসিকতার প্রয়োজন হয়। তবে দেশের বাইরে খেলতে গেলে বিভিন্ন ধরনের কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। ঘরের মাঠের সুবিধা নেওয়া কিংবা স্পিনবান্ধব উইকেটে খেলার মধ্যে কোনো ভুল নেই। আমি এর পক্ষেই আছি। তবে অন্য কন্ডিশনের বাস্তবতাও মেনে নিতে হবে এবং সেগুলোর মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। অস্ট্রেলিয়ায় গেলে আমরা টানা ১০ দিন স্পিনসহায়ক উইকেট পাব না। প্রতিটি দলই নিজেদের শক্তির জায়গা কাজে লাগায়। আমাদের বোলাররা যেমন স্পিন করাতে অভ্যস্ত, তেমনি অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা পেস ও বাউন্সে অভ্যস্ত। এটাই স্বাভাবিক।

টেস্টের বিপরীতে চিত্র ওয়ানডেতে। এই সংস্করণে বাংলাদেশ দলের কি নিজেদের সুদিন পেছনে ফেলে আসার আশঙ্কা রয়েছে?
রাসেল : বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে খেলোয়াড়েরা কীভাবে মাঠে নামছে এবং নিজেদের খেলাটা কীভাবে খেলছে, তার ওপর। আজ আপনি যা করছেন, আগামী বছরও তাতে সাফল্য পাবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সফল হতে হলে নিজেদের শক্তি বাড়াতে হবে এবং ফলাফল এনে দেয়, এমন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোতে হবে। শ্রীলঙ্কা যেমন বিশ্বকাপ জিতেছে, কিংবা ইংল্যান্ডকে ফাইনালে হারিয়ে সাফল্য পেয়েছে, তেমনভাবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বাংলাদেশকে আরও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। খেলোয়াড়দের বুঝতে হবে, প্রতিপক্ষ দলগুলো খেলতে এসে সহজে ম্যাচ ছেড়ে দেবে না। ওয়ানডে ক্রিকেটে ফিল্ডিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে দক্ষ খেলোয়াড়, মানসম্পন্ন ফাস্ট বোলার এবং রান করতে সক্ষম ব্যাটসম্যান নিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে হলে এই জায়গাগুলোতে উন্নতি করতে হবে।