পুলিশের ধাওয়ায় তাহসিফের নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দাবি, ‘হাস্যকর’ বলছেন বাবা

বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসা তথ্যকে অবাস্তব ও হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছেন তার বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম। তার দাবি, একজন সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটার কথা নয়।

শুক্রবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এনায়েতুল করিম বলেন, একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালাবেন-এমন বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটার প্রশ্নই আসে না।

তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে তার বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই ও ব্যবসায়িক অংশীদার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে আটক করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা (পিবিআই)। এর পরদিন সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত নম্বরবিহীন সুজুকি জিক্সার এসএফ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেল উদ্ধারের স্থান থেকে তুরাগ নদের দূরত্ব প্রায় ৫০ গজ।

শুক্রবার দুপুরে দীপকে নিয়ে ওই এলাকায় যায় পিবিআইয়ের একটি দল। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপ জানিয়েছেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ সেখানে অবস্থান করছিলেন। এ সময় পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন তাদের ধাওয়া করেন। তখন দীপ বিআইডব্লিউটিএর একটি সীমানা পিলারের আড়ালে আশ্রয় নেন। আর তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন।

পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, দীপের দাবি অনুযায়ী, পুলিশের পোশাক পরা ব্যক্তিরা তাদের ধাওয়া করেছিলেন। তবে কারা তাদের ধাওয়া দিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মাজার বস্তি এলাকাটি মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত। তবে ওই রাতে তাহসিফ ও দীপ কী কারণে সেখানে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানায়নি তদন্ত সংস্থা।

অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, তারা মাদকাসক্ত ছিলেন কি না, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা জানা যাবে। দীপের দেওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে দেখছে পিবিআই।

ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করার বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না এনায়েতুল করিম। তার মতে, এ ঘটনায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দায়িত্ব নিয়ে কাজ করবে।

তিনি বলেন, মামলা করলে আদালতে যাওয়া-আসাসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাই বিষয়টি নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেবে পরিবার। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে তিনি তাদের দায়িত্বশীল ও আন্তরিক বলে মনে করছেন।

এনায়েতুল করিম বলেন, তাহসিফ একজন পাইলট ছিলেন এবং দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ছিলেন। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে বলে তিনি আশা করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

দীপের সঙ্গে তাহসিফের সম্পর্কের বিষয়ে তার বাবা জানান, চাকরির পাশাপাশি তাহসিফের নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের একটি ব্যবসা ছিল। দীপ ওই ব্যবসার দেখাশোনা করতেন এবং পাশাপাশি পড়াশোনা করতেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। দীপ মাঝেমধ্যে তাদের বাসায় যেতেন। তার পরিবারের সদস্যরাও একবার ওই বাসায় এসেছিলেন।

তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার রাতের ঘটনা তুলে ধরে তার বাবা বলেন, রাতে সর্বশেষ মাকে বার্তা পাঠিয়ে তাহসিফ জানিয়েছিলেন, তিনি শিগগিরই বাসায় ফিরবেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি জানান, তাহসিফের মা সারা রাত জেগে ছিলেন। কিছুক্ষণ পরপর ছেলের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলেকে বাসায় না পেয়ে তিনিও ফোন করেন। কিন্তু তখন ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

পরে দুপুরে ছেলের খোঁজে তুরাগ থানায় যান তিনি। সন্ধ্যার কিছু আগে উত্তরখান থানা থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয়, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় একটি মরদেহ পাওয়া গেছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সেটি তার ছেলে তাহসিফের বলে জানানো হয়।

এনায়েতুল করিম বলেন, ওই এলাকায় তাহসিফ আগে কখনো গিয়েছেন বলে তার মনে পড়ে না। সাধারণত বন্ধুদের সঙ্গে বের হলে তিনি গুলশান-বনানী এলাকায় যেতেন।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য ধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে আলোচনায় আসা বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।

মরদেহ উদ্ধারের স্থানটি উত্তরখান থানার আওতাধীন। অন্যদিকে, তার মোটরসাইকেল উদ্ধারের স্থান টঙ্গী পশ্চিম থানার অধীন। তবে দুটি স্থানই তুরাগ নদের সঙ্গে সংযুক্ত।